২১ বছরের অপেক্ষা, এক নির্দোষের আর্তনাদ—বিচার কি একদিন ফিরে আসবে?
ফাঁসির রায়ে হতাশ নুরুল ইসলাম সরকার বলেছিলেন, “আমি দোষ করিনি”—আজও ছেলের আহ্বান, ‘বাবার মুক্তি চাই, ন্যায়বিচার চাই’
- আপডেট সময় : ০৪:৫২:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ জুলাই ২০২৫
- / ২১১৫ বার পড়া হয়েছে

একটি হত্যা মামলার রায় ঘোষণার দিন আদালত কক্ষের নিস্তব্ধতা ভেঙে নুরুল ইসলাম সরকারের কণ্ঠে ঝরে পড়েছিল অসহায় আর্তনাদ। তিনি বলেছিলেন, “এই রায় একটি ইমোশনাল রায়। আদালত আবেগ তাড়িত হয়ে আমার বিরুদ্ধে এ রায় দিয়েছে। আমি কোনো দোষ করিনি। আহসান উল্লাহ মাস্টারকে আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি। এ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। আমাকে জড়িয়ে কোনো সাক্ষী বা আসামি কোনো ধরনের বক্তব্য দেয়নি। আমি আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার চাই।”

এই বাক্যগুলো আজও তার সন্তান রনি সরকার (শাহানুর ইসলাম রনি) শেয়ার করেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে—যেন একটি ন্যায়বিচারবঞ্চিত আত্মার করুণ আর্তি, যেটি ২১ বছর ধরে কারারুদ্ধ থেকেও হার মানেনি।
নুরুল ইসলাম সরকার—একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা, সমাজসেবী এবং এলাকার জননন্দিত মুখ। গাজীপুরের মানুষ যারা তাকে কাছ থেকে চেনেন, তারা জানেন তার সেবামূলক কাজের কথা। কিন্তু এক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাকে জড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়—যেখানে আজও বহুজন প্রশ্ন তোলেন, “এই রায় কি সত্যিই নিরপেক্ষ ছিল?”
ছেলে রনি সরকারের ভাষায়, “আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। আজ সে-ই ব্যক্তি বছরের পর বছর ধরে বিচারপ্রক্রিয়ার নামে কারাগারে বন্দি। অথচ তার বিরুদ্ধে নেই কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, নেই কোনো অপরাধ স্বীকারোক্তি। শুধুই একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র—যা তাকে জীবনের শেষ প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।”
রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, নাকি ন্যায়বিচার? এই প্রশ্ন আজও ঘুরপাক খায়। বহু মানবাধিকার কর্মী, আইনজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজ বারবার এ রায়ের পুনঃমূল্যায়নের দাবি তুলেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, কেন একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত ছিলেন একজন সজ্জন নেতা হিসেবে, তাকে এমন দণ্ড দেওয়া হলো যেখানে প্রমাণ বা সাক্ষ্যের ঘাটতি ছিল?
একটি জাতির দায়, একজন মুক্তিযোদ্ধাকে যদি সত্যিই মিথ্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি ব্যক্তির প্রতি নয়, একটি জাতির ইতিহাস ও বিবেকের প্রতিও অন্যায়। আজ ২১ বছর পার হলেও তার মুক্তির জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে পরিবার।
ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে, নুরুল ইসলাম সরকারের পুত্র রনি সরকারের ভাষায়, “আমরা শুধু ন্যায়বিচার চাই। আমার বাবার জীবনের বাকি সময় যেন অন্তত স্বাধীনভাবে কাটাতে পারেন, সেই আকুতি জানাই রাষ্ট্রের কাছে।”
তাদের মতো বহু পরিবার আজও অপেক্ষায়—আশায় বুক বাঁধে, হয়তো কোনোদিন সত্য সামনে আসবে, এবং বিচার পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে একজন নির্দোষ মুক্তি পাবে।
রাষ্ট্রের উচিত সত্যের অনুসন্ধান করা। যদি একজন নিরপরাধ মুক্তিযোদ্ধা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে মৃত্যুদণ্ড পান, তাহলে তা আমাদের বিচারব্যবস্থার ওপর একটি কালো দাগ হয়ে থাকবে। এখনো সময় আছে—এই রায় পুনঃমূল্যায়নের মাধ্যমে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার, একজন বীরকে তার সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার।





















