একদিকে ফৌজদারি মামলার অভিযোগ, অন্যদিকে দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার দাবি আইনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় এলাকাজুড়ে আলোচনা
অভিযোগ, সংগ্রাম ও আত্মপক্ষ সমর্থনের এক আলোচিত অধ্যায় দাঁড়াইলের মনোয়ার হোসেন খোকন: বিচারাধীন মামলার মাঝেও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান, সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের বক্তব্য
- আপডেট সময় : ০৬:৫৪:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
- / ১৭০৮ বার পড়া হয়েছে

গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী পশ্চিম থানার দাঁড়াইল পশ্চিমপাড়ার সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে পরিচিত আলহাজ মো. মনোয়ার হোসেন খোকন। একটি মামলায় গ্রেপ্তার, আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ, পরবর্তীতে প্রায় ১৫ দিন পর জামিনে মুক্তি এবং মুক্তির পর সংবাদ সম্মেলন সব মিলিয়ে বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই প্রতিবেদনটি আদালতের নথি, পুলিশের দাখিলকৃত কোর্ট রিপোর্ট, এফআইআর, অভিযোগপত্র এবং জামিন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে মনোয়ার হোসেন খোকন ও তাঁর পরিবারের দেওয়া বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। এখানে উত্থাপিত অভিযোগ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনোটি আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বা অপ্রমাণিত হয়নি।
একটি পরিবারের পরিচয়। দাঁড়াইল পশ্চিমপাড়ার দীর্ঘদিনের বাসিন্দা মনোয়ার হোসেন খোকনের পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গে এলাকাবাসীর অনেকের পরিচিতি রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন, পিতা: মরহুম কুদরত আলী মাতাব্বর, মাতা: আলহাজ রোকেয়া বেগম, স্ত্রী: আশা আক্তার পান্না, একমাত্র ছেলে: আশরাফুল ইসলাম অন্তর (পরিবারের ভাষ্যমতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী)। সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজন উপস্থিত থেকে দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও ধর্মীয় নানা কর্মকাণ্ডে খোকনের সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁদের পরিবার মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছে।
মামলার সূত্রপাত। পুলিশের নথি অনুযায়ী, ৬ জুলাই ২০২৬ সন্ধ্যায় দাঁড়াইল পশ্চিমপাড়ায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর, হামলা, আহত করা এবং ছিনতাইয়ের অভিযোগে পরদিন টঙ্গী পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের হয়। এফআইআরে অভিযোগ করা হয় যে একদল ব্যক্তি বাদীর বাড়িতে প্রবেশ করে হামলা চালায়, আহত করে এবং নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যায়। পুলিশ পরদিন মনোয়ার হোসেন খোকন, তাঁর ছেলে আশরাফুল ইসলাম অন্তর গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় ও অন্য দুইজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পুলিশ আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কারাগারে রাখার আবেদন জানায়। উল্লেখ্য, এসব অভিযোগ বর্তমানে বিচারাধীন; আদালত এখনো অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি।
জামিনের পর সংবাদ সম্মেলন, জামিনে মুক্তির পর নিজ বাড়ির সামনে সংবাদ সম্মেলনে মনোয়ার হোসেন খোকন বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য বিচার বা তদন্তকে প্রভাবিত করা নয়।
তাঁর ভাষায়, “আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আদালত ও তদন্তকারী সংস্থার প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। আমরা শুধু চাই, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হোক এবং প্রকৃত সত্য সামনে আসুক।”
পরিবারের দাবি, ঘটনার দিন একটি সামাজিক সালিশের পর ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল। তবে পরিকল্পিত হামলা, লুটপাট বা সহিংসতার অভিযোগ তাঁরা অস্বীকার করেন। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলেকে ঘিরে পরিবারের উদ্বেগ। সংবাদ সম্মেলনে খোকনের পরিবারের অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিল তাঁর ছেলে আশরাফুল ইসলাম অন্তরের বিরুদ্ধে মামলা। পরিবারের দাবি, তিনি একজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী এবং পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এটি পরিবারের বক্তব্য; এ বিষয়ে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান।
রাজনীতি, মামলা ও দীর্ঘ পথচলা। মনোয়ার হোসেন খোকন জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁর দাবি অনুযায়ী, অতীতে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছিল এবং তিনি গ্রেপ্তার, কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। তিনি আরও দাবি করেন, চোখে গুরুতর আঘাতের পর দেশে ও বিদেশে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এই দাবিগুলোর বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য চিকিৎসা নথি বা আদালতের মূল্যায়ন এই প্রতিবেদনের আওতায় উপস্থাপিত নয়।
সামাজিক কর্মকাণ্ডের দাবি। পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং কয়েকজন সমর্থকের ভাষ্যমতে, মনোয়ার হোসেন খোকন স্থানীয়ভাবে, অসহায় মানুষের সহায়তা, ঈদ ও রমজানে খাদ্য বিতরণ, মসজিদ ও কবরস্থানের উন্নয়ন, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা, কর্মসংস্থানের উদ্যোগ ইত্যাদি কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। এসব কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সমর্থকদের ইতিবাচক বক্তব্য থাকলেও এর পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন মূল্যায়ন এই প্রতিবেদনের আওতায় করা হয়নি।
পরিবারের পাঁচ দফা দাবি, সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের পক্ষ থেকে পাঁচটি বিষয় তুলে ধরা হয়, ১. নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা। ২. প্রত্যেক অভিযুক্তের ভূমিকা পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা। ৩. নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন। ৪. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য প্রচার বন্ধ করা। ৫. বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি দেওয়া।
আইনের শাসনের প্রশ্ন ? এই ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে ভিন্নমত রয়েছে। একদিকে বাদীপক্ষের গুরুতর অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযুক্ত পরিবারের আত্মপক্ষ সমর্থন।
গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনভিত্তিক সমাজে এ ধরনের ঘটনায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত ও আদালতের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়।
প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ। দাঁড়াইলের এই ঘটনাটি কেবল একটি ফৌজদারি মামলার বিষয় নয়; এটি স্থানীয় সমাজ, রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিল বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। মনোয়ার হোসেন খোকনকে ঘিরে যেমন সমর্থকদের ইতিবাচক মূল্যায়ন রয়েছে, তেমনি তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে কোনো পক্ষের দাবি আদালতের রায়ের আগে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন। তাই অভিযোগ ও আত্মপক্ষ সমর্থন উভয়কেই তাদের নিজস্ব অবস্থানে রেখে দেখা এবং তদন্তকারী সংস্থাকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়াই জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আইনের দৃষ্টিতে, তদন্তের ফলাফল এবং আদালতের রায়ই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে অভিযোগগুলোর ভিত্তি কতটা প্রতিষ্ঠিত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় বা দায়মুক্তি কোথায় দাঁড়ায়। ততদিন পর্যন্ত এই ঘটনাকে ঘিরে সকল পক্ষের বক্তব্য সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করাই সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।















