একটি চারা, একটি স্বপ্ন, একটি বাংলাদেশ গাজীপুরের টঙ্গীতে দুই কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে সবুজের বাগান গড়লেন শেখ মোঃ সুমন; পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তিগত উদ্যোগ থেকে সামাজিক দায়িত্বের এক অনুপ্রেরণার গল্প
- আপডেট সময় : ১০:২০:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
- / ১৫৮০ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের ইতিহাস নদীর ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস সবুজের ইতিহাস। এই দেশের জন্ম পলিমাটি, নদী, ধানক্ষেত, কাশফুল, বট, অশ্বত্থ, কৃষ্ণচূড়া, শিমুল, কদম ও অসংখ্য বৃক্ষের ছায়ায়। যে বাংলাকে কবিরা কাব্যে অমর করেছেন, শিল্পীরা রঙে রঙে এঁকেছেন, মুক্তিযোদ্ধারা আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বাধীন করেছেন সেই বাংলার প্রাণশক্তি আজও লুকিয়ে আছে তার সবুজ প্রকৃতিতে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নগরায়ণ বেড়েছে, কমেছে গাছপালা। কংক্রিটের দেয়াল যত উঁচু হয়েছে, প্রকৃতির সবুজ তত সংকুচিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা আজ আমাদের বাস্তবতা। তাই একটি চারাগাছ এখন আর শুধু একটি গাছ নয় এটি ভবিষ্যৎ, দায়িত্ব এবং আশার প্রতীক। এই উপলব্ধি থেকেই গাজীপুরের টঙ্গীর মোক্তার বাড়ি এলাকায় নিজের বাসার সামনে একটি সবুজ বাগান গড়ে তুলেছেন শেখ মোঃ সুমন। তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে জনসচেতনতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সবুজায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার যে আলোচনা ও উৎসাহ তিনি পেয়েছেন, তা তাঁকে এই উদ্যোগ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জনকল্যাণ, নাগরিক দায়িত্ববোধ ও সামাজিক উদ্যোগের গুরুত্বের কথা বিভিন্ন সময়ে তুলে ধরেছেন। একইভাবে গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম. মঞ্জুরুল করিম রনি স্থানীয় পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ রক্ষার গুরুত্বের বিষয়ে মানুষকে উৎসাহিত করেন বলে তিনি জানান। গাজীপুর মহানগর যুবদলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা উল্লেখ্য, তিনি কেন্দ্রীয় পদ লাভ করেছেন সাজেদুল ইসলামের কাছ থেকেও তিনি সামাজিক ও পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। শেখ মোঃ সুমনের ভাষায়, “দেশকে ভালোবাসার সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি হলো একটি গাছ লাগানো। আজ একটি চারা রোপণ করলে আগামী দিনের শিশুরা তার ছায়া, ফল, নির্মল বাতাস ও সৌন্দর্যের সুফল পাবে। আমরা চাই, প্রতিটি পরিবার সবুজায়নের অংশীদার হোক।”
দুই কন্যার হাতে ভবিষ্যতের বীজ। এই আয়োজনের সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্য ছিল তাঁর দুই কন্যা সাইমা ও সানার অংশগ্রহণ। বাবার সঙ্গে তারা চারা রোপণ করেছে, গাছে পানি দিয়েছে এবং ছোট্ট বাগানের উদ্বোধনে অংশ নিয়েছে। যেন একটি পরিবারের ভালোবাসা থেকেই শুরু হলো ভবিষ্যতের পরিবেশ-সচেতন নাগরিক গড়ে তোলার শিক্ষা।
সবুজের সঙ্গে সমাজের বন্ধন। নিজ উদ্যোগে গড়ে তোলা বাগানে রয়েছে সুপারি, নারিকেল, আম, বিভিন্ন ফলদ, বনজ, ঔষধি ও ফুলের গাছ। তাঁর প্রত্যাশা, এসব গাছ একদিন পথচারীকে ছায়া দেবে, মূলত তিনি মুসল্লিদের জন্য এই ছায়ার ব্যবস্থা করেছেন যেন তারা এখানে বসে শান্তি পায়, পাখির আশ্রয় হবে এবং এলাকার পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে। বৃক্ষরোপণ শেষে এলাকার সম্মানিত ইমামের পরিচালনায় দেশ, জাতি, পরিবেশের ভারসাম্য, সকলের সুস্বাস্থ্য এবং শেখ মোঃ সুমনের দ্রুত আরোগ্য কামনায় বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। পরে উপস্থিত অতিথি, স্থানীয় বাসিন্দা ও নেতাকর্মীদের জন্য সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে তেহারির আয়োজন করা হয়।
একটি উদ্যোগ, অনেক সম্ভাবনায়, শেখ মোঃ সুমন জানান, কেউ যদি নিজ এলাকায় বৃক্ষরোপণ বা ছোট্ট বাগান গড়ে তুলতে চান এবং তাঁর সাধ্যের মধ্যে সহযোগিতা সম্ভব হয়, তাহলে চারাগাছ বা পরামর্শ দিয়ে পাশে থাকার চেষ্টা করবেন। তিনি বলেন, “একটি গাছ শুধু পরিবেশকে নয়, মানুষকেও বাঁচায়। আজ একটি চারা, কাল একটি বাগান, একদিন একটি সবুজ বাংলাদেশ এই স্বপ্নই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।” বাংলাদেশের সবুজ দর্শন, একটি গাছ মানে শুধু ছায়া নয়; একটি গাছ মানে নির্মল বাতাস, পাখির আশ্রয়, মাটির উর্বরতা, জলবায়ুর ভারসাম্য, মানুষের মানসিক প্রশান্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ আগামী। একটি বাগান কেবল ফুলের সমারোহ নয়, এটি মানুষ ও প্রকৃতির বন্ধনের প্রতীক। বাংলা সাহিত্যও আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও জীবনানন্দ দাশের রচনায় প্রকৃতি বারবার ফিরে এসেছে মাতৃভূমির সৌন্দর্য, মানবিকতা ও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। ইসলামী ঐতিহ্যেও পরিবেশের উপকারে আসে এমন কাজ এবং বৃক্ষরোপণকে উৎসাহিত করা হয়েছে। ফলে সবুজায়ন কেবল পরিবেশগত নয়, সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বও বটে।
একটি চারাগাছ কখনো নিজের জন্য বড় হয় না। সে বড় হয় মানুষের জন্য। সে ছায়া দেয়, ফল দেয়, অক্সিজেন দেয়, পাখির আশ্রয় হয় এবং নীরবে ভবিষ্যৎকে রক্ষা করে। টঙ্গীর এই ছোট্ট সবুজ বাগান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বড় পরিবর্তনের সূচনা প্রায়ই ছোট একটি উদ্যোগ থেকে হয়। যদি প্রতিটি পরিবার বছরে অন্তত একটি করে গাছ লাগায়, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি ছোট্ট বাগান গড়ে তোলে এবং সামাজিক সংগঠনগুলো নিয়মিত সবুজায়নের কর্মসূচি গ্রহণ করে, তাহলে আগামী দিনের বাংলাদেশ আরও সবুজ, আরও বাসযোগ্য এবং আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে। একটি চারা হয়তো একাই পৃথিবী বদলে দেবে না। কিন্তু কোটি মানুষের হাতে রোপিত কোটি চারা একদিন একটি দেশের ভবিষ্যৎকে বদলে দিতে পারে।




















