ঢাকা ০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২০০৫ সালে দখল, ২০১২ সালে মার্কেট নির্মাণ, ২০১৯ সালে রশিদের মৃত্যু— তবুও ফেরেনি জায়গা; সালিশ ব্যর্থ, এলাকাবাসীর শান্তি-সমাধানের দাবি। বিশ্লেষকদের মতে ‘রাজনৈতিক দখল সংস্কৃতির ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি’।

এরশাদনগরে স্বেচ্ছাসেবক দলের ক্লাব দখল— দুই দশকের রাজনৈতিক টানাপোড়েন”

md younus
  • আপডেট সময় : ০৯:০২:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ অগাস্ট ২০২৫
  • / ২২১৫ বার পড়া হয়েছে

এরশাদনগরের বড়বাজারের সরু গলি দিয়ে হাঁটলে হঠাৎই চোখে পড়ে এক টুকরো জায়গা, যা একসময় ছিল জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রাণকেন্দ্র। ৫০ ফুট দৈর্ঘ্য আর ২০ ফুট প্রস্থের সেই জায়গায় প্রতিদিন ভিড় জমত তরুণদের। মিটিং, আলোচনা, পোস্টার লেখার প্রস্তুতি, সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা— সবকিছুর সাক্ষী ছিল সেই ক্লাব।
কিন্তু আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক টুকরো মার্কেট। দোকানের শাটার নামানো, কোলাহল, আর পাশে দাঁড়িয়ে মানুষের দীর্ঘশ্বাস—“এটা তো আমাদের ক্লাব ছিল…”
ঘটনার সময়রেখা (২০০৫–২০২৫), ২০০৫ : মৃত রশিদ ডেকোরেটর স্বেচ্ছাসেবক দলের ক্লাবঘর জোরপূর্বক দখল করেন। ২০১২ : জায়গাটির ওপর মার্কেট নির্মাণ করা হয়। ২০১৯ : রশিদ ডেকোরেটরের মৃত্যু। ২০২৫ (১৭ জুলাই) : আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিবাদীরা সালিশ মানতে অস্বীকৃতি জানায়; উল্টো স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা হুমকির মুখে পড়েন।
তারা কী বলেছেন? অভিযোগকারী মোঃ আলাউদ্দিন (সভাপতি, স্বেচ্ছাসেবক দল) “এই জায়গাটা শুধু ইট-পাথর নয়, এটি আমাদের রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র। এখানে আমরা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করেছি। অথচ আমাদের চোখের সামনে জায়গাটি দখল হয়ে গেল। আমরা চাই শান্তিপূর্ণ সমাধান।”
বিবাদীপক্ষের এক সদস্য (পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক), “এই জায়গা আমরা অনেক আগে থেকেই ব্যবহার করছি। এটা নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা চলেছে। এখন তারা এসে বলছে এটা তাদের ক্লাব! সবকিছু রাজনৈতিকভাবে প্রচার করছে।”
এলাকার প্রবীণ হাজি আব্দুল খালেক, “আমরা দেখেছি এখানে তরুণরা কীভাবে কাজ করত। এখন জায়গাটা নিয়ে শুধু দ্বন্দ্ব। প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ না করলে পরিস্থিতি খারাপ হবে।”
গৃহবধূ রওশন আরা, “আমরা শান্তি চাই। কাগজপত্র দেখে যার অধিকার, তার হাতে জায়গা তুলে দেওয়া হোক।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মন্তব্য, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. কামরুল হাসান বলেন—“বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্লাব, মাঠ, প্রতিষ্ঠান দখল নতুন নয়। ক্ষমতার পালাবদল হলেই এমন জায়গা রাজনৈতিক শক্তির অধীনে চলে যায়। এরশাদনগরের ঘটনাটিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।”
তিনি আরও বলেন—“এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দখলদারিত্ব শুধু সম্পত্তি নয়, গণতন্ত্রকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রশাসনকে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে, নইলে সাধারণ মানুষ আস্থাহীন হয়ে পড়বে।”
আবেগঘন বাস্তবতা ও শেষ দৃশ্য, এরশাদনগরের এই ক্লাব আসলে কেবল একটি জায়গা নয়—এটি তরুণদের স্বপ্ন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র, আর এলাকার মানুষের সামাজিক আশ্রয়।
গোধূলির আলোয় মার্কেটের ভেতর থেকে দোকানের শাটার বন্ধ হওয়ার শব্দ আসে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে ওঠে—“আমরা কি কোনোদিন আমাদের ক্লাবে ফিরতে পারব?”
এরশাদনগরের বাতাসে আজ ভাসছে শুধু একটি প্রশ্ন—ক্লাব কি ফিরবে তার প্রকৃত মালিকের কাছে, নাকি দখলের অন্ধকারেই হারিয়ে যাবে একটি রাজনৈতিক প্রজন্মের স্বপ্ন?

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

২০০৫ সালে দখল, ২০১২ সালে মার্কেট নির্মাণ, ২০১৯ সালে রশিদের মৃত্যু— তবুও ফেরেনি জায়গা; সালিশ ব্যর্থ, এলাকাবাসীর শান্তি-সমাধানের দাবি। বিশ্লেষকদের মতে ‘রাজনৈতিক দখল সংস্কৃতির ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি’।

এরশাদনগরে স্বেচ্ছাসেবক দলের ক্লাব দখল— দুই দশকের রাজনৈতিক টানাপোড়েন”

আপডেট সময় : ০৯:০২:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ অগাস্ট ২০২৫

এরশাদনগরের বড়বাজারের সরু গলি দিয়ে হাঁটলে হঠাৎই চোখে পড়ে এক টুকরো জায়গা, যা একসময় ছিল জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের প্রাণকেন্দ্র। ৫০ ফুট দৈর্ঘ্য আর ২০ ফুট প্রস্থের সেই জায়গায় প্রতিদিন ভিড় জমত তরুণদের। মিটিং, আলোচনা, পোস্টার লেখার প্রস্তুতি, সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা— সবকিছুর সাক্ষী ছিল সেই ক্লাব।
কিন্তু আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক টুকরো মার্কেট। দোকানের শাটার নামানো, কোলাহল, আর পাশে দাঁড়িয়ে মানুষের দীর্ঘশ্বাস—“এটা তো আমাদের ক্লাব ছিল…”
ঘটনার সময়রেখা (২০০৫–২০২৫), ২০০৫ : মৃত রশিদ ডেকোরেটর স্বেচ্ছাসেবক দলের ক্লাবঘর জোরপূর্বক দখল করেন। ২০১২ : জায়গাটির ওপর মার্কেট নির্মাণ করা হয়। ২০১৯ : রশিদ ডেকোরেটরের মৃত্যু। ২০২৫ (১৭ জুলাই) : আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিবাদীরা সালিশ মানতে অস্বীকৃতি জানায়; উল্টো স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা হুমকির মুখে পড়েন।
তারা কী বলেছেন? অভিযোগকারী মোঃ আলাউদ্দিন (সভাপতি, স্বেচ্ছাসেবক দল) “এই জায়গাটা শুধু ইট-পাথর নয়, এটি আমাদের রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র। এখানে আমরা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করেছি। অথচ আমাদের চোখের সামনে জায়গাটি দখল হয়ে গেল। আমরা চাই শান্তিপূর্ণ সমাধান।”
বিবাদীপক্ষের এক সদস্য (পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক), “এই জায়গা আমরা অনেক আগে থেকেই ব্যবহার করছি। এটা নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা চলেছে। এখন তারা এসে বলছে এটা তাদের ক্লাব! সবকিছু রাজনৈতিকভাবে প্রচার করছে।”
এলাকার প্রবীণ হাজি আব্দুল খালেক, “আমরা দেখেছি এখানে তরুণরা কীভাবে কাজ করত। এখন জায়গাটা নিয়ে শুধু দ্বন্দ্ব। প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ না করলে পরিস্থিতি খারাপ হবে।”
গৃহবধূ রওশন আরা, “আমরা শান্তি চাই। কাগজপত্র দেখে যার অধিকার, তার হাতে জায়গা তুলে দেওয়া হোক।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মন্তব্য, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. কামরুল হাসান বলেন—“বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্লাব, মাঠ, প্রতিষ্ঠান দখল নতুন নয়। ক্ষমতার পালাবদল হলেই এমন জায়গা রাজনৈতিক শক্তির অধীনে চলে যায়। এরশাদনগরের ঘটনাটিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।”
তিনি আরও বলেন—“এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দখলদারিত্ব শুধু সম্পত্তি নয়, গণতন্ত্রকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রশাসনকে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে, নইলে সাধারণ মানুষ আস্থাহীন হয়ে পড়বে।”
আবেগঘন বাস্তবতা ও শেষ দৃশ্য, এরশাদনগরের এই ক্লাব আসলে কেবল একটি জায়গা নয়—এটি তরুণদের স্বপ্ন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র, আর এলাকার মানুষের সামাজিক আশ্রয়।
গোধূলির আলোয় মার্কেটের ভেতর থেকে দোকানের শাটার বন্ধ হওয়ার শব্দ আসে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে ওঠে—“আমরা কি কোনোদিন আমাদের ক্লাবে ফিরতে পারব?”
এরশাদনগরের বাতাসে আজ ভাসছে শুধু একটি প্রশ্ন—ক্লাব কি ফিরবে তার প্রকৃত মালিকের কাছে, নাকি দখলের অন্ধকারেই হারিয়ে যাবে একটি রাজনৈতিক প্রজন্মের স্বপ্ন?