অন্যায়ের কারাগারে বন্দী এক জননেতা, মুক্তির জন্য ছেলের নিরলস সংগ্রাম—টঙ্গী থেকে সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত দীর্ঘ পথচলা
প্রতিরোধের উত্তরাধিকার: মুক্তিযোদ্ধা নূরুল ইসলাম সরকার ও তার সন্তান শাহনুর ইসলাম সরকার রনির ২১ বছরের ন্যায়বিচারের লড়া
- আপডেট সময় : ০৩:১২:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৫
- / ২২২৯ বার পড়া হয়েছে


গাজীপুরের টঙ্গীর মানুষের কাছে নূরুল ইসলাম সরকার শুধু একজন রাজনীতিক নন—তিনি মুক্তিযুদ্ধের সাহসী যোদ্ধা, ন্যায় ও মানুষের অধিকারের প্রতীক। কিন্তু ২০০৪ সালের আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার সাজানো অভিযোগে তিনি টানা ২১ বছর ধরে কারাগারের অন্ধকারে। তার ছেলে, মোহাম্মদ শাহনুর ইসলাম সরকার রনি, বাবার মুক্তির জন্য নিজের জীবন ও ক্যারিয়ার উৎসর্গ করেছেন। এই প্রতিবেদন সেই দুই প্রজন্মের সংগ্রাম, ত্যাগ ও প্রতিরোধের গল্প।
প্রথম অধ্যায়: স্বাধীনতার জন্য লড়াই থেকে রাজনৈতিক মঞ্চে, নূরুল ইসলাম সরকার মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর তিনি রাজনীতিতে যোগ দিয়ে টঙ্গী ও আশপাশের এলাকায় জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সবার আস্থা অর্জন করেন। ন্যায়বিচার, মানুষের কল্যাণ এবং উন্নয়ন তার রাজনৈতিক জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল।
তিনি ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে বিএনপির হয়ে সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করেন এবং টঙ্গীর জনপ্রিয় নেতা হয়ে ওঠেন। ২০০৬ সালের পৌরসভা নির্বাচনে কারাগারে থেকেও তিনি সর্বোচ্চ ভোটে বিজয়ী হন—যা তার প্রতি মানুষের আস্থার প্রতিফলন। কিন্তু কারচুপি করে জয়ী ঘোষণা করা হয় আওয়ামী লীগ প্রার্থী আজমত উল্লাহ খানকে।
দ্বিতীয় অধ্যায়: অন্যায়ের শৃঙ্খল, ২০০৪ সালে আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ড ঘটে। যদিও স্থানীয়দের মতে, এটি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফল, তবুও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে নূরুল ইসলাম সরকারকে মামলায় জড়ানো হয়। সাজানো সাক্ষ্য ও মিথ্যা প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
গাজীপুর সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: লিয়াকত আলী বলেন—
“তার জনপ্রিয়তাই তার অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়। যদি তিনি মুক্ত থাকতেন, আজমত উল্লাহ খান কখনো টঙ্গী পৌরসভার মেয়র হতে পারতেন না।”
তৃতীয় অধ্যায়: টানা ২১ বছরের বন্দিজীবন, ফাঁসির সেলের একঘেয়েমি, অসুস্থতা, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা—সব মিলিয়ে তার ২১ বছরের কারাজীবন এক ভয়াবহ মানবিক ট্র্যাজেডি। মামলাটি সর্বোচ্চ আদালতে আপিল শুনানির অপেক্ষায় আছে, কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের অনিহায় বারবার তারিখ পেছানোয় মুক্তির পথ দীর্ঘ হচ্ছে।
টঙ্গী সচেতন নাগরিক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম খান কালা বলেন—”এটি ন্যায়বিচারের চরম ব্যর্থতা। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে বন্দী রাখা জাতির জন্য কলঙ্ক।”
চতুর্থ অধ্যায়: ছেলের সংগ্রাম—শাহনুর রনি, মোহাম্মদ শাহনুর ইসলাম সরকার রনি বাবার মুক্তির দাবিতে নিরলস লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় কলাম লিখেছেন, গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালিয়েছেন এবং মানববন্ধন, সমাবেশ সংগঠিত করেছেন।
দৈনিক কালবেলায় তার উদ্ধৃতি—”আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ও জনপ্রিয় নেতা। তাকে ফাঁসানো হয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থে। আমরা শুধু ন্যায়বিচার চাই।”
রনির এই প্রচারণা টঙ্গীতে তরুণদের অনুপ্রাণিত করেছে। অনেক তরুণ স্বেচ্ছায় এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে, পোস্টার, ব্যানার, অনলাইন ক্যাম্পেইন চালিয়েছে।
পঞ্চম অধ্যায়: আন্দোলনের ঢেউ ও জনমত, নূরুল ইসলাম সরকারের মুক্তির দাবিতে টঙ্গীতে বহু বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন হয়েছে। এতে দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ অংশ নিয়েছেন। রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে মুক্তিযোদ্ধার মুক্তি দাবিতে একত্র হয়েছেন সবাই।
টঙ্গী প্রেস ক্লাবের সভাপতি আলহাজ মো: মেরাজ উদ্দিন বলেন—”প্রকৃত অপরাধীরা আজও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, আর নির্দোষ মানুষ কারাগারে। অবিলম্বে পুনঃতদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।”
ষষ্ঠ অধ্যায়: আশার আলো, ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর টঙ্গীতে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল—নূরুল ইসলাম সরকারসহ নির্দোষ ব্যক্তিরা দ্রুত মুক্তি পাবেন। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতিতে হতাশা বেড়েছে। তবুও রনি ও তার সমর্থকরা আশা হারাননি। তাদের বিশ্বাস—ন্যায়বিচারের সূর্য একদিন উদিত হবেই।
সমাপ্তি: ন্যায়বিচারের ডাক, এই গল্প কেবল একজন পিতার নয়, এটি একজন মুক্তিযোদ্ধার সম্মান রক্ষার গল্প। এটি সেই ছেলের গল্প, যে বাবার মুক্তির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে।
আবেগঘন সামাজিক বার্তা, “ন্যায়বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে ন্যায়বিচার অস্বীকার। আজ একজন মুক্তিযোদ্ধার উপর অন্যায় হচ্ছে, কাল তা কারো না কারো ঘরে পৌঁছাবে। আসুন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হই—কারণ স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল সবার জন্য সমান ন্যায়বিচার।”




















