গাজীপুর বিএনপিতে বহিষ্কার ও গ্রেপ্তার: শৃঙ্খলা রক্ষা নাকি অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র?
- আপডেট সময় : ১২:১০:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ জুলাই ২০২৫
- / ২১২৯ বার পড়া হয়েছে

গাজীপুর মহানগর বিএনপিতে একের পর এক বহিষ্কার ও গ্রেপ্তারের ঘটনায় স্থানীয় রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়াসে নেওয়া সিদ্ধান্ত হিসেবে এগুলো উপস্থাপিত হলেও, দলের ভেতরে বিভক্তি, ভুল বোঝাবুঝি এবং সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন অনেকেই।


৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে বহিষ্কার ও গ্রেপ্তার : টঙ্গী পূর্ব থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব সিরাজুল ইসলাম সাথীকে দল থেকে বহিষ্কারের মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-১ এর একটি দল।
মঙ্গলবার (৮ জুলাই) পূর্বাচলের ৩০০ ফুট এলাকার পূবাইল থানা সীমানা থেকে তাকে আটক করা হয়। পরে তাকে ‘গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসা সংক্রান্ত’ মামলায় টঙ্গী পশ্চিম থানায় হস্তান্তর করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়। এর আগে (৬ জুলাই) গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল হাসান স্বপনকে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার করে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত: চার নেতার বহিষ্কার : বিএনপির কেন্দ্র থেকে জারি করা পৃথক দুটি চিঠিতে গাজীপুর মহানগরের চার নেতাকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়। তারা হলেন:
রাকিব উদ্দিন সরকার পাপ্পু (সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক)
আব্দুল হালিম মোল্লা (সভাপতি, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দল)
জিয়াউল হাসান (জিএস স্বপন, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক)
সিরাজুল ইসলাম সাথী (সদস্য সচিব, টঙ্গী পূর্ব থানা স্বেচ্ছাসেবক দল)
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, দলীয় আদর্শ ও সংহতির পরিপন্থী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। চিঠিগুলোতে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী ও সহ-দপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. তাইফুল ইসলাম টিপুর স্বাক্ষর রয়েছে।
বহিষ্কারের তালিকায় আরও দুই জেলা একই দিনে নরসিংদী ও সাভারের আরও দুই নেতাকেও বহিষ্কার করা হয়। তারা হলেন:
আব্দুল কাইয়ুম সরকার (সদস্য সচিব, আলোকবালিকা ইউনিয়ন, নরসিংদী) মোশাররফ হোসেন মুসা (সভাপতি, ৭ নং ওয়ার্ড বিএনপি, তেতুলঝোড়া, সাভার) কারণ দর্শানোর নোটিশ: হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ : টঙ্গী পূর্ব থানা বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক কাজী মো. হুমায়ুন কবিরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি গার্মেন্টস ব্যবসায় স্থানীয় আওয়ামী লীগপন্থী কয়েকজনের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন ও আঁতাতে জড়িয়ে পড়েছেন।
তাকে ৩ দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে, অন্যথায় সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
বিতর্ক ও প্রতিক্রিয়া: ষড়যন্ত্র না কি দ্রুত সিদ্ধান্ত ?
বহিষ্কৃত ও গ্রেপ্তার হওয়া নেতাদের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, অনেক সিদ্ধান্তই দলীয় বিভ্রান্তি এবং ষড়যন্ত্রের ফল।
সিরাজুল ইসলাম সাথীর গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে তার এলাকাবাসী ও কর্মীদের দাবি—তিনি কোনো চাঁদাবাজি বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। বরং তাকে ভুল তথ্য দিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বকে বিভ্রান্ত করে বহিষ্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এক সিনিয়র স্থানীয় নেতা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন: “নোটিশ ও বহিষ্কারের মতো বিষয়গুলো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। এতে দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
বিশ্লেষণ: দলীয় শৃঙ্খলা, না রাজনৈতিক জটিলতা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “শৃঙ্খলা রক্ষার নামে যদি স্বচ্ছতা ও পক্ষের কথা শোনার সুযোগ না থাকে, তবে তা অগণতান্ত্রিক শুদ্ধি অভিযানে রূপ নেয়।”
তাদের মতে, জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে গাজীপুর বিএনপির এই টানাপোড়েন আসলে একটি বড় রাজনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।
সমাধানের পথ কী?
১. স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন
২. ভিত্তিহীন ও প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকা
৩. অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য আলোচনার মাধ্যমে সমাধান
৪. গণমাধ্যমে দলীয় তথ্য ফাঁস রোধে কঠোর নীতি
গাজীপুর মহানগর বিএনপিতে চলমান বহিষ্কার ও গ্রেপ্তারের ঘটনায় যে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, তা শুধুই স্থানীয় রাজনীতির সংকট নয়—বরং জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলা প্রশ্নেও বড় এক বার্তা বহন করছে।
দলের ঐক্য, ন্যায্যতা ও কার্যকর নেতৃত্বের অভাব—এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের মূল চাবিকাঠি হতে পারে।
প্রতিবেদনটি স্থানীয় সাংবাদিক, সংশ্লিষ্ট সূত্র ও দলীয় নেতাকর্মীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত। কোনো ব্যক্তি বা দলের সম্মানহানির উদ্দেশ্যে নয়, বরং পাঠকের চিন্তার খোরাক জোগাতেই এই বিশ্লেষণ উপস্থাপন।





















