ঢাকা ০৪:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিচার বিক্রি হয় না, ন্যায় বিক্রি হয় না, বোর্ডবাজার গাছার মানুষের আস্থার অনানুষ্ঠানিক মীমাংসাস্থল মোঃ মনিরুল ইসলাম বাবুল সিপাই

যেখানে বিরোধ থামে কথায়, সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন এক মানুষ

md younus
  • আপডেট সময় : ০৪:২৩:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ১৫৮৪ বার পড়া হয়েছে




একটি ঘরে দুই পক্ষ বসে আছে। এক পক্ষের চোখে রাগ, অন্য পক্ষের চোখে অভিমান। কেউ বলছেন জমি তাঁর, কেউ বলছেন বায়না তাঁর। কোথাও স্বামী-স্ত্রীর দীর্ঘদিনের মনোমালিন্য, কোথাও দুই পরিবারের বিরোধ। কোথাও আবার রাস্তা দিয়ে চলাচল, প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া কিংবা ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে উত্তেজনা। কথা বাড়তে বাড়তে কখনো থানা পর্যন্ত যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। কখনো মামলা-মোকদ্দমার আশঙ্কা দেখা দেয়। কিন্তু গাছার কিছু এলাকায় এমনও দেখা যায়, বিরোধ তৈরি হওয়ার পর মানুষ প্রথমেই ছুটে যান একজন মানুষের কাছে। তিনি মোঃ মনিরুল ইসলাম বাবুল সিপাই।
রাজনীতিতে তিনি গাছা মেট্রো থানা বিএনপির সভাপতি হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ের সংবাদ প্রতিবেদনেও তাঁকে গাছা থানা বিএনপির সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু স্থানীয় মানুষের কাছে তাঁর আরেকটি পরিচয়ও তৈরি হয়েছে, বিরোধ মীমাংসায় বসেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের ভাষ্য অনুযায়ী কোনো পারিশ্রমিক নেন না। এ যেন রাজনীতির পরিচয়ের বাইরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক অন্য অধ্যায়।
বিচারের টেবিলে পরিচয় নয়, কথা বলে সত্য, স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, শরিফপুর, ওঝারপাড়া, ঠুন্ডা, বোর্ডবাজার এবং আশপাশের ৩৪, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডসহ বোর্ডবাজার গাছা এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিরোধ নিয়ে তাঁর কাছে আসেন। তাঁর মীমাংসার পদ্ধতিটি অনেকের কাছে আলাদা। প্রথমে তিনি দুই পক্ষকে বসান। তারপর এক পক্ষের কথা শোনেন। অন্য পক্ষের কথা শোনেন। প্রয়োজনে পরিবারের সদস্যদের ডাকেন। পাড়া-প্রতিবেশীদের বক্তব্য নেন। এরপর উপস্থিত সাক্ষী-প্রমাণ ও উভয় পক্ষের বক্তব্য মিলিয়ে সমস্যার মূল কারণটি বোঝার চেষ্টা করেন। অর্থাৎ, আগে কথা, তারপর সত্যতা যাচাই, তারপর সমাধানের চেষ্টা। এটাই তাঁর অনুসৃত পদ্ধতি বলে স্থানীয়রা জানান।
মী-স্ত্রীর ঝগড়া থেকে দুই পরিবারের শান্তি, একটি সংসারের ঝগড়া কখনো শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি কথার সঙ্গে আরেকটি কথা যোগ হয়। অভিমান জমে। পরিবারের মানুষ যুক্ত হয়। একসময় ছোট সমস্যা বড় বিরোধে রূপ নেয়। এমন পরিস্থিতিতে বাবুল সিপাইয়ের কাছে গেলে তিনি শুধু স্বামী-স্ত্রীকে বসান না, প্রয়োজনে দুই পরিবারের সদস্যদেরও ডাকেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। কে কী বলেছেন, কেন বলেছেন, কার ভুল কোথায়, কার আচরণে সমস্যা তৈরি হয়েছে, এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেন। তারপর চেষ্টা করেন এমন একটি সমাধানে পৌঁছাতে, যাতে সম্পর্কটি ভেঙে না যায়। কারণ তাঁর কাছে মীমাংসা মানে শুধু একজনকে জয়ী আর অন্যজনকে পরাজিত করা নয়; বরং সম্ভব হলে দুই পক্ষকেই শান্তির জায়গায় নিয়ে আসা।
জমির বিরোধে কাগজ, সাক্ষী ও বক্তব্য, সবই শোনা হয়, জমি নিয়ে বিরোধ বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরতলির সমাজে নতুন কিছু নয়। একই জমি কখনো ব্যাংকে বন্ধক রাখা হয়, কখনো ঋণের সঙ্গে যুক্ত থাকে, আবার সেই জমি অন্যের কাছে বিক্রি বা বায়না দেওয়া নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের অভিযোগ নিয়েও মানুষ তাঁর কাছে আসে বলে স্থানীয়রা জানান। এক্ষেত্রে তিনি উভয় পক্ষকে সামনে বসিয়ে জানতে চান, জমির মালিক কে ? কাগজপত্র কী ? কার কাছে কী চুক্তি হয়েছে ? কত টাকা লেনদেন হয়েছে ?
কেউ সাক্ষী ছিলেন কি না ? কোন পক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে কোন প্রমাণ মেলে ? তারপর তিনি দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার পথ খোঁজেন। তবে জমির মালিকানা, দলিল বা আইনি অধিকার নির্ধারণের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব আদালত ও সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রতিষ্ঠানের, এ বিষয়টিও মনে রাখা জরুরি।
মারামারি নয়, কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা, কোনো এলাকায় মারামারি হয়েছে, এমন খবর এলে তাঁর কাছে মানুষ ছুটে আসেন বলে স্থানীয়দের বক্তব্য। কিন্তু তিনি শুধু জানতে চান না “কে কাকে মেরেছে ?” বরং জানতে চান, “ঝগড়াটা শুরু হলো কেন ?” তারপর আগের ঘটনা কী ছিল, কে কী বলেছিল, কার সঙ্গে কার বিরোধ ছিল, এসব শুনে মূল কারণ বের করার চেষ্টা করেন। কারণ একটি মারামারি বন্ধ করা সাময়িক সমাধান। কিন্তু মারামারির কারণ দূর করতে পারলে ভবিষ্যতের বিরোধও কমতে পারে। এই চিন্তাধারাই তাঁর মীমাংসা পদ্ধতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক বলে স্থানীয়রা মনে করেন।
বিচারের বিনিময়ে টাকা নয়, এটাই তাঁর দাবি, মনিরুল ইসলাম বাবুল সিপাইয়ের নিজের বক্তব্য হলো, “আমি কোনো টাকা-পয়সা নিই না। কাউকে ঘুষ দিতে দিই না। আমার বিচার ন্যায্য হবে, কারণ মৃত্যুর পর আমাকে আমার কাজের জবাব দিতে হবে।” এই বক্তব্যই তাঁর মীমাংসা-চর্চার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দাবি। তিনি বলেন, কারও কাছ থেকে টাকা নিয়ে বিচার করলে সেই বিচার আর ন্যায়বিচার থাকে না। তাই তাঁর কাছে কোনো পক্ষ টাকা-পয়সা নিয়ে এলে তিনি তা গ্রহণ না করার এবং প্রকাশ্যভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করেন বলে তাঁর বক্তব্য।
১৫ মিনিট, ৩০ মিনিট, কখনো আরও বেশি; কিন্তু লক্ষ্য একটাই, স্থানীয়দের কেউ কেউ বলেন, তাঁর কাছে আসা অনেক ছোটখাটো বিরোধ দীর্ঘ সময় না নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই মীমাংসার দিকে যায়। কখনো ১৫ মিনিট। কখনো ৩০ মিনিট। কখনো পরিস্থিতি জটিল হলে আরও বেশি সময়। অবশ্য সব বিরোধ এত দ্রুত সমাধান করা সম্ভব নয়। তবু তাঁর পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য হলো, দুই পক্ষকে মুখোমুখি বসিয়ে কথা বলানো। অনেক সময় মানুষ বাইরে থেকে যে সমস্যাকে বড় মনে করেন, মুখোমুখি বসে কথা বলার পর দেখা যায় সমস্যাটির মূল কারণ তুলনামূলক ছোট। সেখানেই তাঁর ভূমিকা হয়ে ওঠে একজন মধ্যস্থতাকারীর।
থানা নয়, আগে সামাজিক সমাধানের চেষ্টা, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। কোনো অভিযোগ গুরুতর হলে, অপরাধ সংঘটিত হলে, নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে কিংবা আইনি অধিকার নির্ধারণের প্রয়োজন হলে অবশ্যই পুলিশ, আইনজীবী ও আদালতের দ্বারস্থ হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ছোটখাটো সামাজিক বিরোধ, পারিবারিক ভুল বোঝাবুঝি কিংবা প্রতিবেশীসুলভ দ্বন্দ্ব, এসব ক্ষেত্রে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা অনেক সময় উত্তেজনা কমাতে পারে। মনিরুল ইসলাম বাবুল সিপাইয়ের মীমাংসার উদ্যোগকে স্থানীয়রা এই সামাজিক সমঝোতার জায়গা হিসেবেই বর্ণনা করেন।
রাজনীতির ভেতরেও মীমাংসাকারীর ভূমিকা, শুধু সাধারণ মানুষের বিরোধ নয়, দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও কোনো সমস্যা হলে অনেকে তাঁর কাছে যান বলে তাঁর সহকর্মীদের ভাষ্য। গাছা থানা বিএনপির সাংগঠনিক বিষয়ে তাঁর সভাপতিত্বে বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হওয়ার তথ্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে। দলের ভেতরের মতবিরোধ হলে তাঁর কাছে গিয়ে কথা বলার প্রবণতা রয়েছে বলেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের কেউ কেউ জানান। এক্ষেত্রেও তাঁর কথার মূল সুর, ব্যক্তি নয়, সমস্যা নিয়ে কথা বলো। অভিযোগ নয়, প্রমাণ দাও। রাগ নয়, সমাধানের পথ খোঁজো।
সাধারণ জীবন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও নৈতিকতার কথা, তাঁর ঘনিষ্ঠদের ভাষ্য অনুযায়ী, মনিরুল ইসলাম বাবুল সিপাই ব্যক্তিগত জীবনে সাদাসিধে চলাফেরা পছন্দ করেন এবং নিয়মিত নামাজ আদায়ের প্রতি গুরুত্ব দেন। ইসলামি মূল্যবোধের আলোকে তিনি ন্যায়, আমানতদারি ও মানুষের হক আদায়ের কথা বলেন। তাঁর বিচার-মীমাংসার ক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধের যে বিষয়টি তিনি সামনে আনেন, সেটি হলো, মানুষের সামনে সাময়িকভাবে একটি সিদ্ধান্ত দেওয়া যায়, কিন্তু আল্লাহর কাছে নিজের কাজের জবাবদিহি এড়ানো যায় না। তাই তাঁর বক্তব্যে বারবার ফিরে আসে, “মানুষের হক নষ্ট করা যাবে না।” কেন মানুষ তাঁর কাছে আসে ? সম্ভবত এই প্রশ্নটির উত্তর সবচেয়ে ভালো দিতে পারবেন তাঁর কাছে যাঁরা গেছেন। কেউ হয়তো স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া নিয়ে গেছেন। কেউ জমির বিরোধ নিয়ে। কেউ প্রতিবেশীর সঙ্গে সমস্যা নিয়ে। কেউ ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে। কেউ আবার দলীয় সাংগঠনিক বিরোধ নিয়ে। তাঁদের সবার অভিজ্ঞতা এক নয়। কোনো বিরোধ তাঁর কথায় মিটেছে, কোনোটি হয়তো আইনি পথে গেছে। কিন্তু স্থানীয়দের একটি অংশের বক্তব্য, তিনি অন্তত দুই পক্ষকে বসিয়ে কথা শোনার একটি সুযোগ তৈরি করেন। আর অনেক সময় মানুষ শুধু এমন একজন শ্রোতাই খোঁজেন, যিনি তাঁদের কথা ধৈর্য ধরে শুনবেন।
একটি চেয়ারে বসে ১০–১৫টি মানুষের গল্প, দিনের পর দিন এভাবে মানুষের সমস্যা শুনতে শুনতে একটি মানুষ কত গল্পের সাক্ষী হন, তার হিসাব হয়তো কোনো খাতায় লেখা নেই। একজনের সংসার। অন্যজনের জমি। কারও টাকা। কারও সম্মান। কারও পারিবারিক সম্পর্ক। কারও প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ। কারও রাজনৈতিক মতভেদ। সবকিছুর কেন্দ্রে এসে দাঁড়ায় একজন মানুষ এবং একটি প্রশ্ন, “সমস্যাটা আসলে কোথায় ?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তাঁর কাছে প্রতিদিন একাধিক মানুষ আসেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
‘বিচার আস্থানা’, কিন্তু আইনের বিকল্প নয়, স্থানীয়দের কেউ কেউ আবেগের সঙ্গে তাঁর বসার জায়গাকে “বিচার-মীমাংসার আস্থানা” বলে অভিহিত করেন। এই শব্দটির মধ্যে রয়েছে মানুষের আস্থা। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, কোনো ব্যক্তিগত সালিশ বা সামাজিক মীমাংসা আদালত, পুলিশ বা আইনগত প্রক্রিয়ার বিকল্প নয়। বরং স্বেচ্ছায় ও আইনসম্মতভাবে ছোটখাটো বিরোধের সামাজিক সমাধানের একটি উদ্যোগ হিসেবে এটিকে দেখা যেতে পারে। আর সেখানেই বাবুল সিপাইয়ের ভূমিকা আলাদা গুরুত্ব পায়।
ইতিহাস শুধু বড় পদে লেখা হয় না, রাজনীতির ইতিহাসে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, নেতা, এসব পদ লেখা থাকে। কিন্তু সমাজের ইতিহাসে আরও কিছু নাম লেখা হয় অন্যভাবে। কারও নাম লেখা হয় মানুষের বিপদে পাশে থাকার জন্য। কারও নাম লেখা হয় রক্তদান করার জন্য। কারও নাম লেখা হয় স্কুল বানানোর জন্য। আর কারও নাম হয়তো লেখা থাকে, “মানুষের কথা শুনতেন।” মনিরুল ইসলাম বাবুল সিপাইকে নিয়ে স্থানীয়দের বর্ণিত এই মীমাংসা-চর্চার গল্প সেই ধরনের একটি সামাজিক ইতিহাসের উপাদান হতে পারে। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি যদি এই কাজের ধারাবাহিকতা সত্যিই দীর্ঘদিনের হয় এবং স্থানীয় মানুষের সাক্ষ্য ও নথি দিয়ে তা যাচাই করা যায়, তাহলে এটি গাছার সামাজিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য মানবিক অধ্যায় হিসেবে সংরক্ষণযোগ্য।
শেষ কথা: বিচারকের আসন নয়, ন্যায়ের দায়, তিনি নিজেকে কোনো আদালতের বিচারক দাবি করেন না। তিনি একজন রাজনৈতিক নেতা। একজন স্থানীয় মানুষ। একজন সামাজিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার দাবি করেন। আর তাঁর নিজের বিশ্বাস, মানুষের বিরোধ মেটাতে বসলে প্রথমে নিজের স্বার্থকে সরিয়ে রাখতে হয়। কারণ টাকা দিয়ে পাওয়া সিদ্ধান্ত আর বিবেক দিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত এক জিনিস নয়। তাঁর ভাষায়, “মানুষের কাছ থেকে কিছু নিয়ে বিচার করলে আমি আল্লাহর কাছে কী জবাব দেব ?” এই প্রশ্নই তাঁর মীমাংসা-চর্চার সবচেয়ে বড় পরিচয় বলে তিনি মনে করেন। হয়তো এ কারণেই প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যেও মানুষ তাঁর দরজায় আসে।
কেউ আসে কান্না নিয়ে। কেউ আসে ক্ষোভ নিয়ে। কেউ আসে অভিযোগ নিয়ে। আর কেউ আসে শুধু এই আশায়, “একবার বাবুল ভাইয়ের কাছে বসি, হয়তো একটা সমাধান হবে।” ইতিহাসের বড় বড় অধ্যায় সবসময় রাজপ্রাসাদে লেখা হয় না। কখনো কখনো ইতিহাস লেখা হয় একটি সাধারণ ঘরের টেবিলে, যেখানে দুই পক্ষ মুখোমুখি বসে, একজন কথা বলে, অন্যজন শোনে, সাক্ষী কথা বলে, সত্য খোঁজা হয়, আর শেষে চেষ্টা করা হয়, **একটি ঝগড়াকে শান্তিতে, একটি বিরোধকে সমঝোতায়, একটি পরিবারকে ভাঙনের হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে।** মোঃ মনিরুল ইসলাম বাবুল সিপাই, রাজনীতির পরিচয়ের পাশাপাশি স্থানীয় মীমাংসা-চর্চার এই অধ্যায়টিও যদি প্রমাণ, সাক্ষ্য ও নথিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে সেটিই হতে পারে তাঁর জনজীবনের এক ভিন্নধর্মী ইতিহাস।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

বিচার বিক্রি হয় না, ন্যায় বিক্রি হয় না, বোর্ডবাজার গাছার মানুষের আস্থার অনানুষ্ঠানিক মীমাংসাস্থল মোঃ মনিরুল ইসলাম বাবুল সিপাই

যেখানে বিরোধ থামে কথায়, সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন এক মানুষ

আপডেট সময় : ০৪:২৩:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একটি ঘরে দুই পক্ষ বসে আছে। এক পক্ষের চোখে রাগ, অন্য পক্ষের চোখে অভিমান। কেউ বলছেন জমি তাঁর, কেউ বলছেন বায়না তাঁর। কোথাও স্বামী-স্ত্রীর দীর্ঘদিনের মনোমালিন্য, কোথাও দুই পরিবারের বিরোধ। কোথাও আবার রাস্তা দিয়ে চলাচল, প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া কিংবা ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে উত্তেজনা। কথা বাড়তে বাড়তে কখনো থানা পর্যন্ত যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। কখনো মামলা-মোকদ্দমার আশঙ্কা দেখা দেয়। কিন্তু গাছার কিছু এলাকায় এমনও দেখা যায়, বিরোধ তৈরি হওয়ার পর মানুষ প্রথমেই ছুটে যান একজন মানুষের কাছে। তিনি মোঃ মনিরুল ইসলাম বাবুল সিপাই।
রাজনীতিতে তিনি গাছা মেট্রো থানা বিএনপির সভাপতি হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ের সংবাদ প্রতিবেদনেও তাঁকে গাছা থানা বিএনপির সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু স্থানীয় মানুষের কাছে তাঁর আরেকটি পরিচয়ও তৈরি হয়েছে, বিরোধ মীমাংসায় বসেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের ভাষ্য অনুযায়ী কোনো পারিশ্রমিক নেন না। এ যেন রাজনীতির পরিচয়ের বাইরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক অন্য অধ্যায়।
বিচারের টেবিলে পরিচয় নয়, কথা বলে সত্য, স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, শরিফপুর, ওঝারপাড়া, ঠুন্ডা, বোর্ডবাজার এবং আশপাশের ৩৪, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডসহ বোর্ডবাজার গাছা এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিরোধ নিয়ে তাঁর কাছে আসেন। তাঁর মীমাংসার পদ্ধতিটি অনেকের কাছে আলাদা। প্রথমে তিনি দুই পক্ষকে বসান। তারপর এক পক্ষের কথা শোনেন। অন্য পক্ষের কথা শোনেন। প্রয়োজনে পরিবারের সদস্যদের ডাকেন। পাড়া-প্রতিবেশীদের বক্তব্য নেন। এরপর উপস্থিত সাক্ষী-প্রমাণ ও উভয় পক্ষের বক্তব্য মিলিয়ে সমস্যার মূল কারণটি বোঝার চেষ্টা করেন। অর্থাৎ, আগে কথা, তারপর সত্যতা যাচাই, তারপর সমাধানের চেষ্টা। এটাই তাঁর অনুসৃত পদ্ধতি বলে স্থানীয়রা জানান।
মী-স্ত্রীর ঝগড়া থেকে দুই পরিবারের শান্তি, একটি সংসারের ঝগড়া কখনো শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি কথার সঙ্গে আরেকটি কথা যোগ হয়। অভিমান জমে। পরিবারের মানুষ যুক্ত হয়। একসময় ছোট সমস্যা বড় বিরোধে রূপ নেয়। এমন পরিস্থিতিতে বাবুল সিপাইয়ের কাছে গেলে তিনি শুধু স্বামী-স্ত্রীকে বসান না, প্রয়োজনে দুই পরিবারের সদস্যদেরও ডাকেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। কে কী বলেছেন, কেন বলেছেন, কার ভুল কোথায়, কার আচরণে সমস্যা তৈরি হয়েছে, এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেন। তারপর চেষ্টা করেন এমন একটি সমাধানে পৌঁছাতে, যাতে সম্পর্কটি ভেঙে না যায়। কারণ তাঁর কাছে মীমাংসা মানে শুধু একজনকে জয়ী আর অন্যজনকে পরাজিত করা নয়; বরং সম্ভব হলে দুই পক্ষকেই শান্তির জায়গায় নিয়ে আসা।
জমির বিরোধে কাগজ, সাক্ষী ও বক্তব্য, সবই শোনা হয়, জমি নিয়ে বিরোধ বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরতলির সমাজে নতুন কিছু নয়। একই জমি কখনো ব্যাংকে বন্ধক রাখা হয়, কখনো ঋণের সঙ্গে যুক্ত থাকে, আবার সেই জমি অন্যের কাছে বিক্রি বা বায়না দেওয়া নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের অভিযোগ নিয়েও মানুষ তাঁর কাছে আসে বলে স্থানীয়রা জানান। এক্ষেত্রে তিনি উভয় পক্ষকে সামনে বসিয়ে জানতে চান, জমির মালিক কে ? কাগজপত্র কী ? কার কাছে কী চুক্তি হয়েছে ? কত টাকা লেনদেন হয়েছে ?
কেউ সাক্ষী ছিলেন কি না ? কোন পক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে কোন প্রমাণ মেলে ? তারপর তিনি দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার পথ খোঁজেন। তবে জমির মালিকানা, দলিল বা আইনি অধিকার নির্ধারণের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব আদালত ও সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রতিষ্ঠানের, এ বিষয়টিও মনে রাখা জরুরি।
মারামারি নয়, কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা, কোনো এলাকায় মারামারি হয়েছে, এমন খবর এলে তাঁর কাছে মানুষ ছুটে আসেন বলে স্থানীয়দের বক্তব্য। কিন্তু তিনি শুধু জানতে চান না “কে কাকে মেরেছে ?” বরং জানতে চান, “ঝগড়াটা শুরু হলো কেন ?” তারপর আগের ঘটনা কী ছিল, কে কী বলেছিল, কার সঙ্গে কার বিরোধ ছিল, এসব শুনে মূল কারণ বের করার চেষ্টা করেন। কারণ একটি মারামারি বন্ধ করা সাময়িক সমাধান। কিন্তু মারামারির কারণ দূর করতে পারলে ভবিষ্যতের বিরোধও কমতে পারে। এই চিন্তাধারাই তাঁর মীমাংসা পদ্ধতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক বলে স্থানীয়রা মনে করেন।
বিচারের বিনিময়ে টাকা নয়, এটাই তাঁর দাবি, মনিরুল ইসলাম বাবুল সিপাইয়ের নিজের বক্তব্য হলো, “আমি কোনো টাকা-পয়সা নিই না। কাউকে ঘুষ দিতে দিই না। আমার বিচার ন্যায্য হবে, কারণ মৃত্যুর পর আমাকে আমার কাজের জবাব দিতে হবে।” এই বক্তব্যই তাঁর মীমাংসা-চর্চার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দাবি। তিনি বলেন, কারও কাছ থেকে টাকা নিয়ে বিচার করলে সেই বিচার আর ন্যায়বিচার থাকে না। তাই তাঁর কাছে কোনো পক্ষ টাকা-পয়সা নিয়ে এলে তিনি তা গ্রহণ না করার এবং প্রকাশ্যভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করেন বলে তাঁর বক্তব্য।
১৫ মিনিট, ৩০ মিনিট, কখনো আরও বেশি; কিন্তু লক্ষ্য একটাই, স্থানীয়দের কেউ কেউ বলেন, তাঁর কাছে আসা অনেক ছোটখাটো বিরোধ দীর্ঘ সময় না নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই মীমাংসার দিকে যায়। কখনো ১৫ মিনিট। কখনো ৩০ মিনিট। কখনো পরিস্থিতি জটিল হলে আরও বেশি সময়। অবশ্য সব বিরোধ এত দ্রুত সমাধান করা সম্ভব নয়। তবু তাঁর পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য হলো, দুই পক্ষকে মুখোমুখি বসিয়ে কথা বলানো। অনেক সময় মানুষ বাইরে থেকে যে সমস্যাকে বড় মনে করেন, মুখোমুখি বসে কথা বলার পর দেখা যায় সমস্যাটির মূল কারণ তুলনামূলক ছোট। সেখানেই তাঁর ভূমিকা হয়ে ওঠে একজন মধ্যস্থতাকারীর।
থানা নয়, আগে সামাজিক সমাধানের চেষ্টা, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। কোনো অভিযোগ গুরুতর হলে, অপরাধ সংঘটিত হলে, নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে কিংবা আইনি অধিকার নির্ধারণের প্রয়োজন হলে অবশ্যই পুলিশ, আইনজীবী ও আদালতের দ্বারস্থ হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ছোটখাটো সামাজিক বিরোধ, পারিবারিক ভুল বোঝাবুঝি কিংবা প্রতিবেশীসুলভ দ্বন্দ্ব, এসব ক্ষেত্রে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা অনেক সময় উত্তেজনা কমাতে পারে। মনিরুল ইসলাম বাবুল সিপাইয়ের মীমাংসার উদ্যোগকে স্থানীয়রা এই সামাজিক সমঝোতার জায়গা হিসেবেই বর্ণনা করেন।
রাজনীতির ভেতরেও মীমাংসাকারীর ভূমিকা, শুধু সাধারণ মানুষের বিরোধ নয়, দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও কোনো সমস্যা হলে অনেকে তাঁর কাছে যান বলে তাঁর সহকর্মীদের ভাষ্য। গাছা থানা বিএনপির সাংগঠনিক বিষয়ে তাঁর সভাপতিত্বে বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হওয়ার তথ্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে। দলের ভেতরের মতবিরোধ হলে তাঁর কাছে গিয়ে কথা বলার প্রবণতা রয়েছে বলেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের কেউ কেউ জানান। এক্ষেত্রেও তাঁর কথার মূল সুর, ব্যক্তি নয়, সমস্যা নিয়ে কথা বলো। অভিযোগ নয়, প্রমাণ দাও। রাগ নয়, সমাধানের পথ খোঁজো।
সাধারণ জীবন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও নৈতিকতার কথা, তাঁর ঘনিষ্ঠদের ভাষ্য অনুযায়ী, মনিরুল ইসলাম বাবুল সিপাই ব্যক্তিগত জীবনে সাদাসিধে চলাফেরা পছন্দ করেন এবং নিয়মিত নামাজ আদায়ের প্রতি গুরুত্ব দেন। ইসলামি মূল্যবোধের আলোকে তিনি ন্যায়, আমানতদারি ও মানুষের হক আদায়ের কথা বলেন। তাঁর বিচার-মীমাংসার ক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধের যে বিষয়টি তিনি সামনে আনেন, সেটি হলো, মানুষের সামনে সাময়িকভাবে একটি সিদ্ধান্ত দেওয়া যায়, কিন্তু আল্লাহর কাছে নিজের কাজের জবাবদিহি এড়ানো যায় না। তাই তাঁর বক্তব্যে বারবার ফিরে আসে, “মানুষের হক নষ্ট করা যাবে না।” কেন মানুষ তাঁর কাছে আসে ? সম্ভবত এই প্রশ্নটির উত্তর সবচেয়ে ভালো দিতে পারবেন তাঁর কাছে যাঁরা গেছেন। কেউ হয়তো স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া নিয়ে গেছেন। কেউ জমির বিরোধ নিয়ে। কেউ প্রতিবেশীর সঙ্গে সমস্যা নিয়ে। কেউ ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে। কেউ আবার দলীয় সাংগঠনিক বিরোধ নিয়ে। তাঁদের সবার অভিজ্ঞতা এক নয়। কোনো বিরোধ তাঁর কথায় মিটেছে, কোনোটি হয়তো আইনি পথে গেছে। কিন্তু স্থানীয়দের একটি অংশের বক্তব্য, তিনি অন্তত দুই পক্ষকে বসিয়ে কথা শোনার একটি সুযোগ তৈরি করেন। আর অনেক সময় মানুষ শুধু এমন একজন শ্রোতাই খোঁজেন, যিনি তাঁদের কথা ধৈর্য ধরে শুনবেন।
একটি চেয়ারে বসে ১০–১৫টি মানুষের গল্প, দিনের পর দিন এভাবে মানুষের সমস্যা শুনতে শুনতে একটি মানুষ কত গল্পের সাক্ষী হন, তার হিসাব হয়তো কোনো খাতায় লেখা নেই। একজনের সংসার। অন্যজনের জমি। কারও টাকা। কারও সম্মান। কারও পারিবারিক সম্পর্ক। কারও প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ। কারও রাজনৈতিক মতভেদ। সবকিছুর কেন্দ্রে এসে দাঁড়ায় একজন মানুষ এবং একটি প্রশ্ন, “সমস্যাটা আসলে কোথায় ?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তাঁর কাছে প্রতিদিন একাধিক মানুষ আসেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
‘বিচার আস্থানা’, কিন্তু আইনের বিকল্প নয়, স্থানীয়দের কেউ কেউ আবেগের সঙ্গে তাঁর বসার জায়গাকে “বিচার-মীমাংসার আস্থানা” বলে অভিহিত করেন। এই শব্দটির মধ্যে রয়েছে মানুষের আস্থা। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, কোনো ব্যক্তিগত সালিশ বা সামাজিক মীমাংসা আদালত, পুলিশ বা আইনগত প্রক্রিয়ার বিকল্প নয়। বরং স্বেচ্ছায় ও আইনসম্মতভাবে ছোটখাটো বিরোধের সামাজিক সমাধানের একটি উদ্যোগ হিসেবে এটিকে দেখা যেতে পারে। আর সেখানেই বাবুল সিপাইয়ের ভূমিকা আলাদা গুরুত্ব পায়।
ইতিহাস শুধু বড় পদে লেখা হয় না, রাজনীতির ইতিহাসে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, নেতা, এসব পদ লেখা থাকে। কিন্তু সমাজের ইতিহাসে আরও কিছু নাম লেখা হয় অন্যভাবে। কারও নাম লেখা হয় মানুষের বিপদে পাশে থাকার জন্য। কারও নাম লেখা হয় রক্তদান করার জন্য। কারও নাম লেখা হয় স্কুল বানানোর জন্য। আর কারও নাম হয়তো লেখা থাকে, “মানুষের কথা শুনতেন।” মনিরুল ইসলাম বাবুল সিপাইকে নিয়ে স্থানীয়দের বর্ণিত এই মীমাংসা-চর্চার গল্প সেই ধরনের একটি সামাজিক ইতিহাসের উপাদান হতে পারে। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি যদি এই কাজের ধারাবাহিকতা সত্যিই দীর্ঘদিনের হয় এবং স্থানীয় মানুষের সাক্ষ্য ও নথি দিয়ে তা যাচাই করা যায়, তাহলে এটি গাছার সামাজিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য মানবিক অধ্যায় হিসেবে সংরক্ষণযোগ্য।
শেষ কথা: বিচারকের আসন নয়, ন্যায়ের দায়, তিনি নিজেকে কোনো আদালতের বিচারক দাবি করেন না। তিনি একজন রাজনৈতিক নেতা। একজন স্থানীয় মানুষ। একজন সামাজিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার দাবি করেন। আর তাঁর নিজের বিশ্বাস, মানুষের বিরোধ মেটাতে বসলে প্রথমে নিজের স্বার্থকে সরিয়ে রাখতে হয়। কারণ টাকা দিয়ে পাওয়া সিদ্ধান্ত আর বিবেক দিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত এক জিনিস নয়। তাঁর ভাষায়, “মানুষের কাছ থেকে কিছু নিয়ে বিচার করলে আমি আল্লাহর কাছে কী জবাব দেব ?” এই প্রশ্নই তাঁর মীমাংসা-চর্চার সবচেয়ে বড় পরিচয় বলে তিনি মনে করেন। হয়তো এ কারণেই প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যেও মানুষ তাঁর দরজায় আসে।
কেউ আসে কান্না নিয়ে। কেউ আসে ক্ষোভ নিয়ে। কেউ আসে অভিযোগ নিয়ে। আর কেউ আসে শুধু এই আশায়, “একবার বাবুল ভাইয়ের কাছে বসি, হয়তো একটা সমাধান হবে।” ইতিহাসের বড় বড় অধ্যায় সবসময় রাজপ্রাসাদে লেখা হয় না। কখনো কখনো ইতিহাস লেখা হয় একটি সাধারণ ঘরের টেবিলে, যেখানে দুই পক্ষ মুখোমুখি বসে, একজন কথা বলে, অন্যজন শোনে, সাক্ষী কথা বলে, সত্য খোঁজা হয়, আর শেষে চেষ্টা করা হয়, **একটি ঝগড়াকে শান্তিতে, একটি বিরোধকে সমঝোতায়, একটি পরিবারকে ভাঙনের হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে।** মোঃ মনিরুল ইসলাম বাবুল সিপাই, রাজনীতির পরিচয়ের পাশাপাশি স্থানীয় মীমাংসা-চর্চার এই অধ্যায়টিও যদি প্রমাণ, সাক্ষ্য ও নথিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে সেটিই হতে পারে তাঁর জনজীবনের এক ভিন্নধর্মী ইতিহাস।