নৃশংসতার প্রতিবাদে উত্তাল শালিকচূড়া, এলাকাবাসীর একটাই দাবি: খুনির ফাঁসি চাই
টঙ্গীতে নির্মম হামলায় গুরুতর আহত মোঃ মকসুদ পাটোয়ারী
- আপডেট সময় : ০৪:৫৮:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ মে ২০২৫
- / ২৪১৮ বার পড়া হয়েছে


রফিকুল ইসলাম (৭৫)কে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে।
টঙ্গী পূর্ব থানার শালিকচূড়া এলাকার এক শান্তিপ্রিয় পরিবারে নেমে এসেছে দুঃসহ বিপর্যয়। গত ৯ মে ২০২৫, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এলাকাবাসীর চোখের সামনে ঘটে এক ভয়াবহ নৃশংসতা। প্রতিবেশী রফিকুল ইসলাম (৭৫) কৌশলে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে নির্মম হামলা চালায় মোঃ মকসুদ পাটোয়ারী (৫৫)-এর ওপর।
এই হামলায় গুরুতর আহত মকসুদ পাটোয়ারী এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন ঢাকার গুলশান ইউনাইটেড হাসপাতালে।
দীর্ঘদিনের বিরোধ থেকে ভয়ঙ্কর পরিণতি
ভুক্তভোগীর কন্যা মোসাম্মৎ আয়মন (২০), বাদী হয়ে টঙ্গী পূর্ব থানায় দায়ের করা এজাহারে অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে তাদের পরিবারের সঙ্গে শত্রুতামূলক আচরণ করে আসছিলেন। মূলত বাড়ির ছাদে মেরামতের সময় কিছু সিমেন্টের অংশ রফিকুলের টিনচালে পড়াকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় এই বিরোধ। সামান্য এই ঘটনার জেরে রফিকুল ইসলাম নিয়মিতভাবে গালিগালাজ, হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিলেন।
এলাকাবাসী একাধিকবার বসে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করে এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে কিছু টাকা দেয়ার সিদ্ধান্তে দুই পক্ষ সম্মত হয়। মকসুদ পাটোয়ারী তার সদাচরণ ও শান্তিপূর্ণ মনোভাবের কারণে ক্ষতিপূরণ দিতে রাজিও হন। কিন্তু তারপরও প্রতিশোধের আগুন নেভেনি রফিকুল ইসলামের মনে।
ভয়াবহ হামলার বিবরণ
৯ মে সকাল ৯:৩০টার দিকে মকসুদ পাটোয়ারীকে কৌশলে বাড়ির বাইরে ডেকে নেয় রফিকুল ইসলাম। অতঃপর হঠাৎ ধারালো দা দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপাতে শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শী ও চিকিৎসা সূত্রে জানা যায়, হামলায় মকসুদের নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসে, মাথার খুলির একাংশ উন্মুক্ত হয়ে যায়, পিঠে দু’টি গভীর কোপ এবং বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
পাশের বাসিন্দা মোসাম্মৎ মারজিনা বেগম চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন ছুটে আসে। তারা রক্তাক্ত মকসুদ পাটোয়ারীকে প্রথমে গুটিয়া ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তাকে স্থানান্তর করা হয় গুলশান ইউনাইটেড হাসপাতালে, যেখানে তিনি এখনো চিকিৎসাধীন ও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
মামলার অগ্রগতি
ঘটনার পরপরই এলাকাবাসী সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে খুনি রফিকুল ইসলামকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। ১০ মে টঙ্গী পূর্ব থানায় মামলা নং-১৭ অনুযায়ী এজাহার দায়ের হয়। মামলায় দণ্ডবিধির ধারা ৩২৩ (আঘাত), ৩২৬ (গুরুতর আঘাত), ৩৮৫ (জোরপূর্বক অর্থ আদায়), ৩০৭ (হত্যাচেষ্টা) এবং ৫০৬ (হুমকি) সংযুক্ত করা হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন এসআই (নিঃ) মুসাব্বির হোসেন (বিপি-৮৪০৫১০৫৭৭৯)।
জনমতের বিস্ফোরণ
এই ঘটনায় পুরো শালিকচূড়া ও আশপাশের এলাকাগুলোতে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসী ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। বহু মানুষ প্ল্যাকার্ড, ব্যানার নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে “খুনির ফাঁসি চাই” স্লোগান দিয়ে। তারা বলেন, “আমরা আজ নিরাপত্তাহীন। দিনের আলোয় মানুষকে কুপিয়ে মারা হয়, এটা কোনো সভ্য সমাজে হতে পারে না।”
একজন বয়োজ্যেষ্ঠ প্রতিবেশী বলেন, “মকসুদ একজন বিনয়ী, নিরীহ মানুষ। তার অপরাধ কী ছিল? রফিকুল যে কাজ করেছে তা শুধু শাস্তিযোগ্য নয়, সমাজের জন্য ভয়ঙ্কর উদাহরণ।”
কন্যার আর্তি: “আমার বাবার অপরাধ ছিল সোজা পথে চলা”
বাদী আয়মন বিষ বলেন, “আমার বাবার একমাত্র অপরাধ ছিল—সোজা পথে চলা, কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করা। সেই সরলতাকেই পুঁজি করে তাকে হত্যা করতে চেয়েছে রফিকুল।”
তার দাবি, “আমরা চিরতরে বাবাকে হারাতে চাই না। তার সুচিকিৎসা ও পূর্ণ পুনর্বাসন চাই। আর সেই রফিকুলের ফাঁসি চাই, যাতে সমাজে এমন নৃশংসতা আর না ঘটে।”
শেষ কথা
এই ঘটনা আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের এক করুণ দৃষ্টান্ত। একজন সাধারণ, শান্তিপ্রিয় মানুষ আজ মৃত্যুর মুখে। অপরাধী ধরা পড়েছে ঠিকই, কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া যেন আরেক ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষায় না পড়ে। এলাকাবাসী ও মানবিক মানুষদের একটাই দাবি—“মুকসুদ পাটোয়ারীর জন্য সুবিচার এবং খুনির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।”

















