দোহা থেকে লাস ভেগাস—দুই মহাদেশে বাংলাদেশের গৌরবগাথা লিখলেন টঙ্গীর সন্তান, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ক্রীড়াবিদ মজিবুর রহমান। যেখানে বয়স নয়, অনুপ্রেরণাই সাফল্যের চাবিকাঠি
৮৩ বছর বয়সেও দেশের পতাকা উঁচুতে — বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান (ক্রীড়াবিদ)-এর জীবনের এক অলৌকিক অধ্যায়
- আপডেট সময় : ০৬:২৬:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৫
- / ২২৪৫ বার পড়া হয়েছে


ভোরের সূর্য ওঠে যেমন ধীরে, কিন্তু দৃঢ় আলো নিয়ে—তেমনি বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান (ক্রীড়াবিদ)-এর জীবন যেন এক নবোদয়ের গল্প। বয়স ৮৩, কিন্তু দৃষ্টি আজও তীক্ষ্ণ, কণ্ঠে দৃঢ়তা, মনে আছে আগুনের মতো উচ্ছ্বাস। দেশের পতাকা যখন বিদেশের মাটিতে উড়লো, তিনি নিঃশব্দে বলেছিলেন, “এটাই আমার বাংলাদেশ, এটাই আমার জীবনসার্থকতা।” ২০২৫ সালের মে মাস। কাতারের রাজধানী দোহা তখন ক্রীড়ার মহাসমুদ্র। ৬২টি দেশ, শত শত প্রতিযোগী—কেউ তরুণ, কেউ প্রবীণ। কিন্তু সবাই অবাক হয়ে তাকিয়েছিল বাংলাদেশের এক প্রবীণ যোদ্ধার দিকে, ৮৩ বছর বয়সী ক্রীড়াবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান (ক্রীড়াবিদ)।

২৭ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রথম এশিয়ান মাস্টার ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি তুললেন এমন এক ভার, যা কেবল লোহার নয়—এক জাতির সম্মানের ভার। ফলাফল ঘোষণায় উঠে এলো গর্বের নাম—স্বর্ণপদক: বাংলাদেশ। এর তিন মাস পর, সেপ্টেম্বরের গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে ওয়ার্ল্ড মাস্টার ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপ (অফ আমেরিকা)-এ অংশ নিয়ে তিনি অর্জন করেন রৌপ্যপদক, আর প্রতিধ্বনি ওঠে, “Bangladesh… Mujibur Rahman!” লাস ভেগাসের আকাশে ভেসে ওঠে বাংলাদেশের নাম, গর্বে ভরে ওঠে হৃদয়।

১৯৭১ সালের রণাঙ্গন থেকে আজকের আন্তর্জাতিক ক্রীড়ামঞ্চ- যুদ্ধক্ষেত্র বদলেছে, কিন্তু মজিবুর রহমানের সংগ্রামী মনোভাব অপরিবর্তিত। “যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুকে পরাজিত করেছিলাম অস্ত্রে, এখন নিজেকে পরাজিত না করাই আমার সবচেয়ে বড় বিজয়।”

১৯৬৪ সালে ঢাকা ওয়ান্ডার্স ক্লাব থেকে তাঁর ক্রীড়া যাত্রা শুরু। ১৯৬৭ সালে ভিক্টোরিয়া ক্লাব, ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান ন্যাশনাল গেমস, প্রতিটি ধাপে তিনি গড়েছেন প্রতিজ্ঞা, অধ্যবসায় আর দেশপ্রেমের ইতিহাস।

কোচ, সংগঠক ও অনুপ্রেরণার মানুষ, তিনি শুধু ক্রীড়াবিদ নন—একজন পথ প্রদর্শক, শিক্ষক ও সংগঠক। “Best Organizer of Bangladesh” পুরস্কার তাঁর ঝুলিতে গর্বের সংযোজন। ২০০৮ সালে কোরিয়া, ২০১২ সালে নেপাল, ২০১৩ সালে থাইল্যান্ড ও কাতারে কোচ ও অফিসিয়াল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০১৯ সালে সাউথ এশিয়ান গেমসেও ছিলেন বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধি।

এরশাদনগরে তাঁর গড়া “এরশাদনগর ওয়েটলিফটিং ক্লাব” এখন তরুণদের তীর্থস্থান। এই ক্লাব থেকে অসংখ্য ছেলে-মেয়ে আজ আর্মি, আনসার, পুলিশ ও সরকারি প্রশাসনে চাকরি করছেন। তাঁর হাতে তৈরি এই প্রজন্মই আজ বাংলাদেশের গর্ব। “আমার প্রতিটি শিক্ষার্থীই আমার গর্ব। তারা-ই আগামী দিনের বাংলাদেশ।” -মজিবুর রহমান
তরুণদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে কাজ করছে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘তারুণ্যের উৎসব’। ২০২৫ সালের অনূর্ধ্ব-১৭ জাতীয় ক্লাব ভারোত্তোলন প্রতিযোগিতার মূল আয়োজক ছিলেন তিনি। তাঁর স্লোগান “নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এসো, দেশ বদলাই, পৃথিবী বদলাই।”
এই বাক্য এখন তরুণ প্রজন্মের অনুপ্রেরণার মন্ত্রে পরিণত হয়েছে।
জাতির শ্রদ্ধা ও ফেডারেশনের কৃতজ্ঞতা, বাংলাদেশ ভারোত্তোলন ফেডারেশনের চেয়ারম্যান, উইং কমান্ডার (অব.) মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “৮৩ বছর বয়সেও মজিবুর রহমান (ক্রীড়াবিদ) আমাদের ক্রীড়াজগতের জীবন্ত কিংবদন্তি। দেশের প্রতি ভালোবাসা ও পরিশ্রমের এই গল্প প্রজন্মের পর প্রজন্ম অনুপ্রেরণা জোগাবে।”

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সহায়তায় তিনি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন এবং কৃতজ্ঞতাস্বরূপ প্রতিবার তাঁদের নাম শ্রদ্ধাভরে উচ্চারণ করেন। লেফটেন্যান্ট কর্ণেল মোঃ শহিদুল ইসলাম চৌধুরীর কাছে বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান ক্রীড়াবিদ। “আমার এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী।”
বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান (ক্রীড়াবিদ)-এর এই আন্তর্জাতিক সাফল্যে
পরিবারও গর্বিত ও কৃতজ্ঞ। ছেলে রবিউল হোসেন দুলু বলেন-“আমাদের বাবার সারা জীবনের সংগ্রাম আজ দেশের গর্বে পরিণত হয়েছে। তিনি শুধু আমাদের নন, গোটা বাংলাদেশের অনুপ্রেরণা।”
পরিবারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ভারোত্তোলন ফেডারেশন, বাংলাদেশ আনসার, সহকর্মী, এবং দেশের সকল শুভাকাঙ্ক্ষীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। “শরীর ক্লান্ত হয়, কিন্তু মন যদি সচল থাকে, তবে মানুষ যে কোনো বয়সে ইতিহাস লিখতে পারে।” এই কথাটিই তাঁর জীবনের সারমর্ম। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, সমাজসেবক ও ক্রীড়ানুরাগী-তিন ভূমিকায় এক অবিনাশী আলো, এক জীবন্ত ইতিহাস।
নাম: বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান (ক্রীড়াবিদ), জন্ম: ১৯৪২, ভাণ্ডারিয়া, পিরোজপুর, বরিশাল। ঠিকানা: এরশাদনগর, ৪৯ নং ওয়ার্ড, টঙ্গী, গাজীপুর
অর্জন: ২০২৫ দোহা এশিয়ান মাস্টার ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপ স্বর্ণপদক ২০২৫ লাস ভেগাস ওয়ার্ল্ড মাস্টার ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপ (অফ আমেরিকা)-রৌপ্যপদক, দুইবার শ্রেষ্ঠ কোচ, একবার শ্রেষ্ঠ সংগঠক (Best Organizer), মূলমন্ত্র: “দেশপ্রেমই জীবনের সর্বোচ্চ শক্তি।”
যখন অনেকে জীবনের শেষ প্রান্তে বিশ্রাম খোঁজেন, তখন বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান (ক্রীড়াবিদ) ইতিহাস লিখছেন নতুন করে। তাঁর হাতে আজও উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা- বয়স নয়, মনোবলই তাঁর সাফল্যের চালিকা শক্তি।
এরশাদনগর আজ গর্বিত, গাজীপুরের আকাশে উড়ছে লাল-সবুজ পতাকা
এক প্রবীণ ক্রীড়াবিদের জীবনের অমর গৌরবগাথায় ভাসছে পুরো জাতি।

















