মাদক থেকে দূরে, খেলাধুলার পথে যুবসমাজ, টঙ্গী স্টেডিয়ামে ফুটবল ঘিরে উৎসবের আবহ
মাঠে ফিরছে প্রাণ, ফুটবলে জাগছে নতুন স্বপ্ন প্রশাসক গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট–২০২৬ : টঙ্গী অঞ্চলের ১–০ গোলের জয়ে সেমিফাইনালের দ্বার উন্মোচন
- আপডেট সময় : ০৮:৪৪:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৬২৯ বার পড়া হয়েছে

একসময় যে মাঠে ফুটবলের বাঁশি বাজলেই ছুটে আসত কিশোর-তরুণ, গ্যালারিতে জমত দর্শকের ঢল, আর গোলের মুহূর্তে কেঁপে উঠত চারপাশ, সময়ের স্রোতে সেই দৃশ্য অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছিল। কিন্তু গাজীপুরের টঙ্গী স্টেডিয়ামে আবারও যেন ফিরে এলো সেই হারিয়ে যাওয়া দিনের প্রাণস্পন্দন। দর্শকের উচ্ছ্বাস, খেলোয়াড়দের দুরন্ত ছুটে চলা, আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের উত্তেজনা এবং ব্যান্ডপার্টির বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে পুরো স্টেডিয়াম পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত ক্রীড়াউৎসবে। আর সেই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল “প্রশাসক গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট–২০২৬”। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ টুর্নামেন্টের মধ্য দিয়ে শুধু একটি ফুটবল প্রতিযোগিতাই নয়, বরং শিশু-কিশোর ও যুবসমাজকে মাঠমুখী করার একটি সামাজিক উদ্যোগও দৃশ্যমান হয়েছে।
জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু, খেলা শুরুর আগে যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং পরিবেশিত হয় জাতীয় সংগীত। এরপর মহান আল্লাহর নাম স্মরণ করে শুরু হয় বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচ। উদ্বোধনী আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মোঃ হাসান উদ্দিন সরকার, সাবেক সংসদ সদস্য ও গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি। উদ্বোধক ছিলেন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি মোঃ শওকত হোসেন সরকার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ্ তানজিলা খানম। এ সময় টঙ্গী ও গাজীপুরের বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, গণ্যমান্য নাগরিক, পুলিশ কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের উপস্থিতি এবং দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে টঙ্গী স্টেডিয়াম হয়ে ওঠে গাজীপুরের মানুষের এক মিলনমেলা।
টঙ্গী বনাম বাসন, মাঠজুড়ে টানটান উত্তেজনা, ম্যাচের শুরু থেকেই টঙ্গী অঞ্চল ও বাসন অঞ্চলের খেলোয়াড়দের মধ্যে চলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। একদিকে আক্রমণ, অন্যদিকে দ্রুত পাল্টা আক্রমণ, প্রতিটি মুহূর্তেই ছিল উত্তেজনা। দর্শকদের উচ্ছ্বাসে বারবার মুখর হয়ে ওঠে স্টেডিয়াম। খেলোয়াড়দের প্রতিটি পাস, প্রতিটি আক্রমণ ও গোলের প্রচেষ্টায় গ্যালারি থেকে ভেসে আসে করতালি ও উৎসাহধ্বনি। শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচে ১–০ গোলে জয় পায় টঙ্গী অঞ্চল। এই জয়ের মধ্য দিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় তারা। একটি গোলই নির্ধারণ করে দেয় ম্যাচের ভাগ্য। কিন্তু সেই এক গোলের পেছনে ছিল খেলোয়াড়দের পরিশ্রম, দলীয় সমন্বয়, ধৈর্য এবং মাঠের লড়াই।
“খেলাধুলা তরুণদের ইতিবাচক পথে রাখে”, প্রধান অতিথির বক্তব্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মোঃ হাসান উদ্দিন সরকার এলাকার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি হা-ডু-ডু, দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুটসহ গ্রামীণ খেলাগুলোর কথা উল্লেখ করে বলেন, এসব খেলাধুলা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এগুলোর সঙ্গে গ্রামীণ সমাজ ও সংস্কৃতিরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর বক্তব্যে খেলাধুলাকে শিশু-কিশোর ও তরুণদের সুস্থ বিনোদন এবং নেশাসহ বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা হয়। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের খেলাধুলাকেন্দ্রিক আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

“ক্লিন গ্রিন সিটি”, মাঠে ফেরানোর উদ্যোগ, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোঃ শওকত হোসেন সরকার গাজীপুরকে একটি “ক্লিন গ্রিন সিটি” হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য তুলে ধরার পাশাপাশি শিশু-কিশোর ও যুবকদের জন্য খেলাধুলার পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্যে যুবসমাজকে মাঠমুখী করার প্রয়োজনীয়তা এবং মাদকসহ বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখার ক্ষেত্রে ক্রীড়ার ভূমিকার কথা উঠে আসে। খেলাধুলার পরিবেশ সৃষ্টি, তরুণদের অংশগ্রহণ এবং ক্রীড়াবিদদের উৎসাহিত করার উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে তিনি সবার সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করেন।
খেলা শুধু বিনোদন নয়, প্রজন্ম গড়ারও মাধ্যম, একটি ফুটবল ম্যাচের ৯০ মিনিটের মধ্যে শুধু জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় না, তৈরি হয় দলীয় শৃঙ্খলা, পরিশ্রম, প্রতিযোগিতার মানসিকতা এবং পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ। আজ যে কিশোর মাঠে দৌড়াচ্ছে, আগামী দিনে সে হতে পারে একজন দক্ষ খেলোয়াড়। আজ যে তরুণ গ্যালারিতে বসে খেলা দেখছে, আগামীকাল সে হয়তো নিজেই মাঠে নামবে। আর একটি পরিবার যখন সন্তানকে মাঠে পাঠায়, তখন সেই পরিবার শুধু একটি খেলোয়াড় তৈরি করে না, একটি সুস্থ ও সক্রিয় প্রজন্ম গঠনের প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। এই জায়গাতেই প্রশাসক গোল্ড কাপের সামাজিক তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়।
হারিয়ে যাওয়া খেলাগুলোও ফিরুক মাঠে, ফুটবলের পাশাপাশি একসময় গাজীপুরের পাড়া-মহল্লা ও গ্রামীণ মাঠে জনপ্রিয় ছিল হা-ডু-ডু, দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুটসহ নানা দেশীয় খেলা। প্রযুক্তিনির্ভর জীবন ও সময়ের পরিবর্তনে এসব খেলার অনেকটাই হারিয়ে গেছে। ফলে নতুন প্রজন্মের সামনে মাঠ ও খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করা এখন কেবল বিনোদনের বিষয় নয়; এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতারও একটি অংশ। প্রশাসক গোল্ড কাপের মতো আয়োজন সেই হারানো ক্রীড়াচেতনার দিকে নতুন করে তাকানোর সুযোগ তৈরি করেছে।
দর্শকদের জন্য লটারি ও উপহার, খেলা শেষে আয়োজকদের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠিত হয় লটারি ড্র। এতে দর্শকদের মধ্যে ফুটবলসহ বিভিন্ন ক্রীড়া সামগ্রী ও উপহার বিতরণ করা হয়। দর্শকদের মাঠে আসা, খেলা উপভোগ করা এবং ক্রীড়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ বাড়তি আগ্রহ সৃষ্টি করে। ফলে ম্যাচটি শুধু মাঠের দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; দর্শক, খেলোয়াড় ও আয়োজকদের অংশগ্রহণে তা পরিণত হয়েছে সামাজিক সম্প্রীতি ও ক্রীড়াচেতনার এক মিলনমেলায়।
১–০-এর জয় থেকে বড় স্বপ্নের পথে, টঙ্গী অঞ্চলের ১–০ গোলের জয় হয়তো পরিসংখ্যানের একটি সংখ্যা। কিন্তু সেই সংখ্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি দলের সেমিফাইনালে ওঠার গল্প, খেলোয়াড়দের শ্রম এবং দর্শকদের আবেগ। সামনে এখন সেমিফাইনাল। এরপর ফাইনালের সম্ভাব্য লড়াই। তবে টুর্নামেন্টটির সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হয়তো ট্রফি জয়ের বাইরেও, গাজীপুরের মাঠগুলোতে আবারও দর্শকের ভিড় তৈরি হওয়া, শিশু-কিশোরদের হাতে ফুটবল ওঠা এবং যুবসমাজের সামনে খেলাধুলার একটি ইতিবাচক ক্ষেত্র তৈরি হওয়া। প্রশাসক গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট–২০২৬ তাই শুধু একটি ফুটবল প্রতিযোগিতার নাম নয়; এটি গাজীপুরের ক্রীড়াঙ্গনে মাঠের প্রাণ ফিরিয়ে আনার এক দৃশ্যমান প্রয়াস। টঙ্গী অঞ্চলের ১–০ গোলের জয় সেই যাত্রার একটি অধ্যায়। সামনে আরও ম্যাচ, আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আরও স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে থাকুক একটি প্রাণবন্ত মাঠ, যেখানে ফুটবলের বাঁশি বাজবে, দর্শকের করতালি উঠবে, তরুণেরা ছুটবে এবং গাজীপুরের ক্রীড়াঙ্গন আবারও নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন দেখার জায়গা হয়ে উঠবে।



















