টঙ্গীতে শহীদ নাফিসার বাড়িতে উপদেষ্টার সফর, উপস্থিতিতে আবেগঘন পরিবেশ
- আপডেট সময় : ০৯:৫৮:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ জুলাই ২০২৫
- / ২১৩৮ বার পড়া হয়েছে

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে শহীদ হওয়া সাহসী শিক্ষার্থী নাফিসা হোসেন মারওয়ার শহীদ দিবস উপলক্ষে তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়াতে গাজীপুরের টঙ্গীর এরশাদনগরে তাঁর নিজ বাড়িতে যান মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ। শুক্রবার (৪ জুলাই) দুপুর আড়াইটার দিকে উপদেষ্টার উপস্থিতিতে সেখানে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।


সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ জুলাই যুদ্ধে শহীদ নাফিসা হোসেন মারওয়া এবং সানজিদ হোসেন মৃধার বাসায় ও আত্মীয় স্বজনদের সাথে সহমর্মিতা এবং কবর জিয়ারত করেন।-সংবাদ আলোচনা।
উপদেষ্টার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জুলাই গণআন্দোলনের সংগঠক ও অংশগ্রহণকারী “জুলাই কন্যা” ও “জুলাই ছাত্র” সদস্যরা, যারা কেন্দ্রীয়ভাবে ও গাজীপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে শিক্ষাব্যবস্থা ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
এই সফরে আরও উপস্থিত ছিলেন গাজীপুরের টঙ্গী পূর্ব থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ফরিদুল ইসলাম, যিনি প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহীদ পরিবারকে সহমর্মিতা জানান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জুলাই আন্দোলনের মাঠের অন্যতম সক্রিয় সংগঠক ও প্রগতিশীল তরুণ শরিফ। তিনি বলেন, “শহীদ নাফিসা আমাদের আন্দোলনের প্রতীক। তার রক্ত বৃথা যাবে না। আমরা ন্যায়বিচার, স্বীকৃতি ও শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অর্জনে লড়াই চালিয়ে যাব।”
উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেন, “আমি নিজেও গত বছরের আন্দোলনে মাঠে ছিলাম। আমরা দায়িত্ব নিয়েছি শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর।
ইতোমধ্যে আমরা নাফিসার বাবাকে অনুদান দিয়েছি, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় আরও সহায়তা চলবে। অনেকে অভিযোগ করেন আমরা সময়মতো পৌঁছাতে পারি না—সত্যিই দেরি হয়েছে, কিন্তু ভুলে যাইনি।”
তিনি বলেন, “শহীদদের পরিবার ‘সনদ’ দাবি করছে, যা যৌক্তিক। তবে ‘যোদ্ধা সনদ’ দেওয়া রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে, সেটা কিছুটা সময়সাপেক্ষ। আমরা চেষ্টা করছি আন্দোলনের স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে।”
শহীদ নাফিসার বাবা আবুল হোসেন আবেগভরে বলেন, “আমার মেয়ে কোনো অন্যায় করেনি। সে দেশের জন্য, শিক্ষার্থীদের জন্য দাঁড়িয়েছিল। গুলি করে তাকে মেরে ফেলা হলো। আমি বেঁচে থাকতে চাই বিচার দেখে যেতে। খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
মামা হযরত আলী জানান, আন্দোলনের আগের রাতে নাফিসা জানিয়েছিল সে আন্দোলনে যাবে। সকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গাবতলীতে যাওয়ার কথা বললেও তাকে নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু সে কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে যায়। পরে দুপুর আড়াইটার দিকে ছোট বোন সাফা হোসেনের ফোনে অপরিচিত এক ব্যক্তি কল দিয়ে জানায়,
“নাফিসা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, দ্রুত ল্যাবজোন হাসপাতালে যান।”
হাসপাতালে গিয়ে হযরত আলী নাফিসাকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পান, কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এর পর মরদেহ বাসায় নেওয়ার পথে পুলিশ ফের গুলি ছুড়ে, আহত হন হযরত আলীসহ আরও অনেকে।
প্রথমে সিদ্ধান্ত ছিল সাভারে নানির বাড়িতে ছোট ভাইয়ের কবরের পাশে দাফন করা হবে, কিন্তু শেষপর্যন্ত শহীদ নাফিসার বাবা আবুল হোসেন মেয়েকে নিজ বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করেন।
এই সফরে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা জানান, শহীদ নাফিসার মৃত্যু ছিল একটি বর্বরতা, যা এখনও বিচারহীন রয়ে গেছে।
তাঁরা বলেন,
“একটি বছর পার হয়ে গেলেও শহীদ পরিবার বিচার পায়নি। আমরা আশা করি, সরকারের পক্ষ থেকে এখন কার্যকর পদক্ষেপ আসবে।”
উপদেষ্টা জানান, জুলাই ফাউন্ডেশন ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শহীদ পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং আরও চলমান রয়েছে। তিনি বলেন,
“আমরা এই মৃত্যু ভুলিনি, এই পরিবারগুলোকে ভুলে যেতে চাই না। তাদের পাশে আমরা আছি, থাকব।”
নাফিসা হোসেনের মতো সাহসী কিশোরীদের রক্ত আজও প্রেরণা দেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এ দিনের এই সফর যেন হয় একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের পথে আরেকটি ছোট পদক্ষেপ।











