ঢাকা ০১:৫২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সড়কে মৃত্যু ও পঙ্গু হওয়ার মিছিল দীর্ঘ করছে মোটরসাইকেল বাতিল হতে যাচ্ছে শতাধিক কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন টঙ্গীর রাজপথে যুবদলের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, নেতৃত্বে নাজমুল হোসেন মন্ডল গাজীপুর মহানগর-সদরের পর টঙ্গীতেও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে সরব উপস্থিতি; তারুণ্যের ঐক্য, সাংগঠনিক তৎপরতা ও শৃঙ্খলাবদ্ধ আয়োজনের চিত্র যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে টঙ্গীতে বর্ণাঢ্য র‍্যালি, মিছিল ও সমাবেশ যুবদলের গৌরব, তারুণ্যের শক্তি ও নেতাকর্মীদের আস্থার প্রতীক নাজমুল হোসেন মন্ডল ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা নাজমুল হোসেন মন্ডল ও মোঃ শাহজাহান মিয়া (নগর) যুবদলের রাজনীতিতে এক ফুটন্ত গোলাপ শেখ মোঃ সুমন যুবদলের রাজনীতিতে এক ফুটন্ত গোলাপের নাম শেখ মোঃ সুমন মরহুম কাজী জুলফিকর মোল্লার রুহের মাগফিরাত কামনায় বিনিময় কমপ্লেক্সে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল জিয়া সংসদের কেন্দ্রীয় যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক মনোনীত হলেন মোঃ কামরুজ্জামান টুটুল

“উস্তাদ পথপ্রদর্শক, অভিভাবক সহযোগী—আর সন্তান আমাদের আমানত”

হিফযের আঙিনা থেকে মানুষ গড়ার মহাকাব্য : কুরআনের অক্ষর মুখস্থ করার পাশাপাশি জীবনকে শুদ্ধ করার এক নিরন্তর প্রয়াস মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসা

md younus
  • আপডেট সময় : ১০:১০:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৭৬৩ বার পড়া হয়েছে




টঙ্গীর ইসলামপুর (দত্তপাড়া) এলাকার একটি শান্ত পরিবেশ। ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। চারপাশে দিনের কোলাহল শুরু হওয়ার আগেই কোথাও থেকে ভেসে আসে কুরআন তিলাওয়াতের সুমধুর ধ্বনি। ছোট ছোট কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে আল্লাহর কালাম। কেউ সবক দিচ্ছে, কেউ আগের পড়া ঝালাই করছে, কেউ আবার উস্তাদের সামনে বসে ভুল শুধরে নিচ্ছে।
দৃশ্যটি হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু এই সাধারণ দৃশ্যের আড়ালে চলছে একটি অসাধারণ সংগ্রাম, একজন শিশুকে শুধু হাফেজে কুরআন নয়, বরং একজন সৎ, চরিত্রবান, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সংগ্রাম। এই দীর্ঘ সাধনারই একটি নাম মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসা। হাসান লেন, ইসলামপুর (দত্তপাড়া), টঙ্গী, গাজীপুরে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি হিফয শিক্ষাকে শুধু মুখস্থ করার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে না; বরং এটিকে মনে করে জীবন গঠনের একটি পবিত্র যাত্রা। এখানে একটি শিশুর হাতে শুধু কুরআন তুলে দেওয়া হয় না; তার হৃদয়ে বপন করার চেষ্টা করা হয় ঈমান, তাকওয়া, আদব, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার বীজ। একটি প্রশ্ন, হিফয বিভাগ কার কথায় চলবে ? হিফয বিভাগের পরিচালনা নিয়ে প্রায়ই একটি কথা শোনা যায়, “গার্ডিয়ানের কথায় হিফয বিভাগ চলবে না; বরং উস্তাদের কথার গার্ডিয়ান চলবে।” কথাটির মধ্যে বাস্তবতা থাকলেও বিষয়টি একপাক্ষিকভাবে দেখলে চলবে না। কারণ একটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে উস্তাদ, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর সমন্বিত প্রচেষ্টায়। হিফয বিভাগের মূল দায়িত্ব অবশ্যই উস্তাদের। একজন অভিজ্ঞ ও যোগ্য উস্তাদই বুঝতে পারেন। কোন শিক্ষার্থীকে কতটুকু সবক দেওয়া উচিত, তার আমুখতা ও সাবিনা কীভাবে ঠিক রাখতে হবে, কোথায় সে দুর্বল হচ্ছে এবং কোন পদ্ধতিতে তাকে ধীরে ধীরে একজন সফল হাফেজ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। তাই শিক্ষার পদ্ধতি, পড়ার নিয়ম, সবক, আমুখতা, সাবিনা ও দৈনন্দিন হিফযের শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে উস্তাদের পেশাগত সিদ্ধান্তকে সম্মান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অন্যদিকে অভিভাবকও অপ্রয়োজনীয় নন। একজন বাবা-মা সন্তানের শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক চাপ, পারিবারিক পরিস্থিতি কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো অনেক সময় উস্তাদের চেয়ে ভালো বুঝতে পারেন। তাই অভিভাবকের কথাও শুনতে হবে। তবে সেই মতামত হবে সহযোগিতামূলক, পরিচালনামূলক নয়। অর্থাৎ, উস্তাদ হবেন পথপ্রদর্শক। অভিভাবক হবেন সহযোগী। আর শিক্ষার্থী হবে আমাদের আমানত। এই ভারসাম্যই হতে পারে একটি সফল হিফয বিভাগের ভিত্তি। একটি শিশুর কান্না, আর অভিভাবকের একটি ভুল সিদ্ধান্ত।
ধরা যাক, কোনো একদিন একটি শিশু মাদরাসায় পড়তে চাইছে না। সে কাঁদছে। বলছে, “আম্মু, আমাকে আজ বাসায় নিয়ে যাও।” অভিভাবকের মায়া হচ্ছে। পরিচালকের কাছে ফোন যাচ্ছে, “স্যার, আজকে একটু বাড়ি নিয়ে যাই ?” অনুরোধ, আকুতি, কান্না, শেষ পর্যন্ত হয়তো সন্তানকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হলো। সন্তান তখন একটি ভয়ংকর শিক্ষা শিখে ফেলতে পারে, “আমি কান্না করলেই নিয়ম বদলে যায়।” আজ সে একদিনের জন্য বাড়ি যাবে। কাল সে আরেকটি আবদার করবে। তারপর হয়তো কোনো অনুষ্ঠান, বিয়ে, পারিবারিক আয়োজন কিংবা অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে আবার চলমান ক্লাস থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হবে। একসময় শিশুর মনে প্রতিষ্ঠানের নিয়মের চেয়ে নিজের আবেগের শক্তি বড় হয়ে যেতে পারে। এটি কোনো শিশুর জন্য ভালো শিক্ষা নয়। অভিভাবকের ভালোবাসা সন্তানের জন্য রহমত; কিন্তু অতিরিক্ত প্রশ্রয় কখনো কখনো সেই ভালোবাসাকেই দুর্বলতার জায়গায় নিয়ে যায়। ছুটি মানেই পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্নতা নয়, পারিবারিক অনুষ্ঠান থাকবে। বিয়ে-শাদি থাকবে। আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া থাকবে। সামাজিক দায়িত্বও থাকবে। কিন্তু চেষ্টা হওয়া উচিত, এসব আয়োজন যেন মাদরাসার নির্ধারিত ছুটির সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে করা যায়।
কারণ হিফযের শিক্ষা অন্য অনেক শিক্ষার মতো নয়। একদিনের অনিয়ম কখনো কখনো কয়েক দিনের পড়ার ছন্দ নষ্ট করে দিতে পারে। একজন শিক্ষার্থী নিয়মিত সবক দিচ্ছে, আমুখতা করছে, সাবিনা ঠিক রাখছে, হঠাৎ কয়েকদিনের জন্য রুটিন ভেঙে গেল। বাড়িতে গিয়ে দীর্ঘ সময় আরাম, ঘুম, মোবাইল, বিনোদন ও পারিবারিক ব্যস্ততায় থাকল। ফিরে এসে অনেক সময় তার মন আর আগের জায়গায় থাকে না। তাই প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মানা শুধু মাদরাসার সুবিধার জন্য নয়; সন্তানের নিজের ভবিষ্যতের জন্যও প্রয়োজন। কেন সন্তান ছুটি কাটিয়ে মাদরাসায় ফিরতে চায় না ? এ প্রশ্ন অনেক অভিভাবকের। এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।
মাদরাসায় জীবন নিয়মতান্ত্রিক। নামাজ, তিলাওয়াত, সবক, আমুখতা, পড়াশোনা, বিশ্রাম, সবকিছুর একটি নির্দিষ্ট সময় আছে। অন্যদিকে বাড়িতে দীর্ঘ ছুটিতে শিশুটি হয়তো পেয়ে যায় বেশি আরাম, বেশি ঘুম, বেশি বিনোদন, বেশি স্বাধীনতা। ফলে নিয়মের জীবনে ফিরে আসা তার কাছে কঠিন মনে হতে পারে। এখানে অভিভাবকের দায়িত্ব হলো সন্তানকে বোঝানো। কষ্ট মানেই খারাপ কিছু নয়। জীবনে ধৈর্য শিখতে হয়। অপেক্ষা করতে হয়। কখনো নিজের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কখনো প্রিয় জিনিস থেকে বিরত থাকতে হয়। এই শিক্ষা শিশুর ভবিষ্যৎ চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সব আবদার পূরণ করা ভালোবাসা নয়। আজকের পৃথিবীতে অনেক বাবা-মা সন্তানের কোনো চাওয়া অপূর্ণ রাখতে চান না।
সন্তান কিছু চাইলো, দিয়ে দিলেন। আরেকটি চাইলো, সেটিও দিয়ে দিলেন। আবার কিছু চাইলো, সেটিও পূরণ হলো। কিন্তু জীবনের একটি কঠিন সত্য হলো, যে শিশু সবকিছু সহজে পেয়ে যায়, সে অনেক সময় অপেক্ষা করতে শেখে না। আর যে অপেক্ষা করতে জানে না, সে ধৈর্য শিখতে পারে না। যে ধৈর্য শিখতে পারে না, সে জীবনের কঠিন পরীক্ষার সামনে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সন্তানকে কখনো কখনো সীমাবদ্ধতার শিক্ষা দেওয়া দরকার। তাকে বোঝাতে হবে সব চাওয়া সঙ্গে সঙ্গে পূরণ হয় না।
কিছু জিনিসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কিছু জিনিস অর্জন করতে পরিশ্রম করতে হয়। কিছু আনন্দ ত্যাগ করে বড় স্বপ্নের দিকে এগোতে হয়। এটাই জীবন।
প্রথম দশ বছর, জীবন গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সন্তান স্কুলে পড়ুক কিংবা মাদরাসায়, শৈশব ও কৈশোরের প্রথম দিকের বছরগুলো তার চরিত্র গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে সে যা দেখে, যা শেখে এবং যে অভ্যাস তৈরি করে, তার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত যায়। তাই অভিভাবক যদি প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ভাঙাকে প্রশ্রয় দেন, সন্তানের প্রতিটি আবদারে নিয়ম পরিবর্তন করে দেন কিংবা পড়াশোনার চেয়ে সাময়িক আনন্দকে বেশি গুরুত্ব দেন, তাহলে অজান্তেই সন্তানের ভবিষ্যৎ গঠনে নেতিবাচক ভূমিকা তৈরি হতে পারে। অভিভাবকের দায়িত্ব শুধু সন্তানকে প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে দেওয়া নয়। ভর্তি করানোর পরও দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং তখনই শুরু হয় নতুন দায়িত্ব, উস্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া, নিয়ম মানতে উৎসাহ দেওয়া, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা এবং অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা।
১৮ জুলাই ২০২৬ একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। এই চিন্তা ও দায়িত্ববোধ থেকেই ১৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসায় ছাত্রদের পড়াশোনার মানোন্নয়ন ও হিফয বিভাগের কার্যক্রম নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান আরও উন্নত করা, হিফযের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, উস্তাদদের দায়িত্ব আরও সুসংগঠিত করা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা। একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নতি শুধু বড় ভবন দিয়ে হয় না। উন্নতি হয়, ভালো শিক্ষক,
সুশৃঙ্খল পদ্ধতি, যোগ্য নেতৃত্ব, অভিভাবকের সহযোগিতা। এবং শিক্ষার্থীর আন্তরিক প্রচেষ্টায়। মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসার এই বৈঠক সেই ধারাবাহিক প্রচেষ্টারই একটি অংশ। ২১ বছরের মেহনত, একজন খাদেমের নীরব গল্প। হিফয বিভাগের খেদমতের সঙ্গে দীর্ঘ ২১ বছর ধরে যুক্ত থেকে একজন খাদেমের জীবনও যেন একটি আলাদা গল্প।
এই দীর্ঘ সময়ে কত শত শিশুর সঙ্গে দেখা হয়েছে। কেউ দ্রুত কুরআন মুখস্থ করেছে। কেউ ধীরে এগিয়েছে। কেউ বারবার ভুল করেছে। কেউ হতাশ হয়েছে। কেউ আবার একদিন হঠাৎ এমনভাবে এগিয়ে গেছে যে তার উস্তাদরাও আনন্দে অভিভূত হয়েছেন। কেউ আজ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। কেউ হয়তো দূরে। কেউ এখনো উস্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। আবার কারও সঙ্গে হয়তো দীর্ঘদিন দেখা নেই। কিন্তু একজন কুরআনের শিক্ষক বা খাদেমের কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার হয়তো কোনো পদ-পদবি নয়।
একদিন কোনো প্রাক্তন ছাত্র এসে যদি বলে, “উস্তাদ, আপনার কাছে কুরআন শিখেছিলাম, আজও ভুলিনি।” তখন তার চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে ? বন্ধুবান্ধবের কাছে দূরত্ব, কিন্তু কুরআনের কাছে আরও কাছে। হিফয বিভাগের খেদমতের এই দীর্ঘ পথচলায় ব্যস্ততা বাড়ছে। কাছের-দূরের অনেক বন্ধু, প্রিয়জন ও পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ কিংবা যোগাযোগ কমে যাচ্ছে। কিন্তু এই দূরত্ব কোনো অবহেলার কারণে নয়। এটি একটি দায়িত্বের ব্যস্ততা। কারণ কুরআনের খেদমত এমন এক দায়িত্ব, যেখানে সময়ের হিসাব সবসময় ঘড়ির কাঁটায় হয় না। একটি শিশুর ভুল সংশোধন করতে হয়। একটি দুর্বল সবক আবার শুনতে হয়। একজন মন খারাপ করা শিক্ষার্থীকে সাহস দিতে হয়। কখনো কঠোর হতে হয়। কখনো ভালোবাসতে হয়। কখনো বোঝাতে হয়। কখনো অপেক্ষা করতে হয়। এইভাবেই দিন যায়। মাস যায়। বছর যায়। আর একদিন পেছনে তাকালে দেখা যায়, ২১ বছর কেটে গেছে। “ঈমান মদিনার দিকে ফিরে যাবে” একটি গভীর বার্তা। রাসুলুল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয়ই ঈমান মদিনার দিকে ফিরে যাবে, যেমন সাপ তার গর্তের দিকে ফিরে যায়।” এটি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ হাদিস; সহিহ বুখারি ১৮৭৬-এ এবং সহিহ মুসলিমে অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। এই হাদিস আমাদের সামনে একটি গভীর শিক্ষা তুলে ধরে, ফিতনা ও পরীক্ষার সময়ে ঈমানের প্রতি ফিরে আসা, দ্বীনের প্রতি দৃঢ় থাকা এবং আল্লাহর পথে অবিচল থাকা কত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের শিশুদের যদি কুরআনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, নামাজের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, আদব-আখলাকের শিক্ষা দেওয়া যায়, তাহলে তারা শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য নয়, জীবনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্যও প্রস্তুত হবে।
অপপ্রচার নয়, প্রয়োজন সত্যকে জানার। বর্তমান সময়ে কওমি ও দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা, সমালোচনা ও প্রচারণা দেখা যায়। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তা যাচাই হওয়া উচিত। তবে একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে কোনো কথা ছড়িয়ে পড়লেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি কোনো অভিযোগ থাকলে তা যাচাই না করে উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক নয়। সত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো স্বচ্ছতা। মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসার লক্ষ্য তাই বিতর্কে জড়ানো নয়। লক্ষ্য হলো,
শিক্ষার মান উন্নত করা। উস্তাদদের সমন্বয় বাড়ানো। অভিভাবকদের সচেতন করা। শিক্ষার্থীদের সুন্দরভাবে গড়ে তোলা। এবং কুরআনের খেদমতকে আরও এগিয়ে নেওয়া।
এখানে হিফয মানে শুধু মুখস্থ করা নয়। একজন ছাত্র কুরআন মুখস্থ করল, এটাই কি শেষ ? না। তার আচরণ কেমন ? সে পিতা-মাতাকে সম্মান করে কি না ? উস্তাদকে সম্মান করে কি না ? সত্য কথা বলে কি না ? নামাজের প্রতি যত্নশীল কি না ? ছোটদের ভালোবাসে কি না ? নিজের দায়িত্ব বোঝে কি না ? সমাজের প্রতি তার দায়িত্ববোধ আছে কি না?
কুরআনের আলো যদি তার মুখস্থের মধ্যে থাকে, কিন্তু আচরণে তার প্রতিফলন না ঘটে, তাহলে শিক্ষার পূর্ণতা কোথায় ?
তাই মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসার স্বপ্ন, কুরআনের হাফেজের পাশাপাশি আদর্শ মানুষ তৈরি করা। কুরআনের পাখিদের জন্য আনন্দও আছে শুধু পড়াশোনা, নিয়ম আর শাসন নয়। শিশুর শৈশবও গুরুত্বপূর্ণ। তাই খেলাধুলা, ফুটবল প্রতিযোগিতা, বিভিন্ন আয়োজন, পুরস্কার বিতরণী এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আনন্দময় পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ঈদুল আজহা উপলক্ষে আয়োজিত ফুটবল প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে যখন পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়, তখন তাদের মুখের হাসি যেন বলে দেয়, কুরআনের আঙিনাতেও শৈশব হাসতে জানে। একজন শিশুর হাতে একদিকে কুরআন, অন্যদিকে খেলাধুলার আনন্দ, এই সমন্বয়ই তাকে ভারসাম্যপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
উস্তাদ ও অভিভাবক, দুই হাত এক হলে শিশুর ভবিষ্যৎ শক্ত হয়। একটি শিশুকে একা উস্তাদ গড়ে তুলতে পারেন না। আবার শুধু অভিভাবকের পক্ষেও সবকিছু সম্ভব নয়।
উস্তাদ জানেন শিক্ষার পথ। অভিভাবক জানেন সন্তানের ঘরের জীবন। উস্তাদ দেখেন তার পড়া। অভিভাবক দেখেন তার আচরণ। উস্তাদ তাকে শৃঙ্খলা শেখান। অভিভাবক সেই শৃঙ্খলাকে ঘরেও বাস্তবায়ন করেন। দুই পক্ষের মধ্যে যদি সন্দেহ থাকে, শিশু বিভ্রান্ত হয়। দুই পক্ষের মধ্যে যদি দ্বন্দ্ব থাকে, শিশু সুযোগ নিতে শেখে। কিন্তু দুই পক্ষের মধ্যে যদি আস্থা থাকে, তাহলে একটি শিশু ধীরে ধীরে একজন সুন্দর মানুষ হয়ে ওঠে।
অভিভাবকদের প্রতি হৃদয়ের আহ্বান। প্রিয় অভিভাবক, আপনি আপনার সন্তানকে যখন মাদরাসায় ভর্তি করান, তখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে তাকে পাঠান না। আপনি তাকে একটি পরিবেশের হাতে তুলে দেন। তাই, অপ্রয়োজনীয়ভাবে চলমান ক্লাস থেকে সন্তানকে নিয়ে যাবেন না। সন্তানের কান্নাকে সবসময় সিদ্ধান্তের কারণ বানাবেন না। প্রতিষ্ঠানের নিয়মকে সম্মান করুন। উস্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। সন্তানের শারীরিক বা মানসিক কোনো সমস্যা থাকলে উস্তাদকে জানান। ঘরেও পড়ার পরিবেশ তৈরি করুন।
সব চাওয়া সঙ্গে সঙ্গে পূরণ না করে ধৈর্য ও সংযম শেখান। মনে রাখবেন, আজ আপনি যে সামান্য শৃঙ্খলা সন্তানের ওপর প্রয়োগ করছেন, আগামীকাল সেটিই তার চরিত্রের শক্তি হতে পারে।
একটি প্রতিষ্ঠানকে চিনবেন কীভাবে ? একটি প্রতিষ্ঠানকে শুধু তার ভবন দিয়ে চিনবেন না। দেখুন, সেখানে শিক্ষকরা কেমন ? শিক্ষার্থীরা কেমন ? শৃঙ্খলা কেমন ? অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ কেমন ? শিক্ষার্থীর চরিত্রে কী পরিবর্তন আসছে ? কুরআনের পাশাপাশি তার আচরণে কি ইসলামের সৌন্দর্য ফুটে উঠছে ? কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচয় তার দেয়ালে লেখা নাম নয়। তার ছাত্রদের চরিত্রই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। মুসলিহুল উম্মাহর স্বপ্ন, আজকের শিশু, আগামীর আলোকিত প্রজন্ম, এই প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন শুধু শত শত হাফেজ তৈরি করা নয়। স্বপ্ন আরও বড়। এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা কুরআন জানবে। কুরআন ভালোবাসবে। কুরআনের আদর্শে জীবন পরিচালনার চেষ্টা করবে। পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্বশীল হবে। উস্তাদকে সম্মান করবে। সততাকে ভালোবাসবে। দেশ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করবে। মানুষের পাশে দাঁড়াবে। এবং যেখানে যাবে, সেখানেই একজন মুসলমানের উত্তম চরিত্রের পরিচয় বহন করবে। আপনার সন্তানের জন্য আজকের সিদ্ধান্তই হতে পারে আগামী দিনের পরিচয়। প্রত্যেক বাবা-মা চান তার সন্তান ভালো মানুষ হোক। কেউ চান ডাক্তার হোক। কেউ চান ইঞ্জিনিয়ার হোক। কেউ চান ব্যবসায়ী হোক। কেউ চান প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী হোক।
কিন্তু সব স্বপ্নের আগে একটি স্বপ্ন থাকা উচিত, আমার সন্তান একজন ভালো মানুষ হোক। কারণ পেশা মানুষকে পরিচয় দিতে পারে। কিন্তু চরিত্র মানুষকে সম্মান এনে দেয়। আর সেই চরিত্র গঠনের সময় হলো শৈশব। আজকের একটি সঠিক সিদ্ধান্ত আগামী দিনের জীবনকে বদলে দিতে পারে। দূর থেকে যে প্রতিষ্ঠানকে চিনবে মানুষ। টঙ্গীর ইসলামপুরের একটি প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন আজ শুধু একটি এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার নয়।
স্বপ্ন হলো, একদিন মানুষ দূর থেকে নাম শুনেই বলবে, “মুসলিহুল উম্মাহ ? ওটা সেই প্রতিষ্ঠান, যেখানে শুধু হাফেজ তৈরি হয় না মানুষও তৈরি হয়।” যেখানে উস্তাদরা শুধু পড়ান না গড়েন। যেখানে অভিভাবকরা শুধু সন্তানকে রেখে যান না শিক্ষকদের সঙ্গে পথচলা শিখেন। যেখানে শিশুরা শুধু কুরআন মুখস্থ করে না, কুরআনের আদর্শে জীবন গড়ার প্রাথমিক শিক্ষা নেয়। যেখানে শৃঙ্খলা আছে, কিন্তু ভালোবাসাও আছে। যেখানে কঠোরতা আছে, কিন্তু মানবিকতাও আছে। যেখানে পড়াশোনা আছে, আবার শিশুর হাসিও আছে। যেখানে হিফয আছে, আবার মানুষ হওয়ার স্বপ্নও আছে।
২১ বছরের খেদমত থেকে একটি প্রার্থনা। হিফয বিভাগের খেদমতের দীর্ঘ ২১ বছরের পথচলায় আজও একটি আকাঙ্ক্ষাই সবচেয়ে বড়, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কুরআনের খেদমত করে যেতে চাই। বন্ধুবান্ধব, প্রিয়জন, শুভাকাঙ্ক্ষী, সবার সঙ্গে হয়তো আগের মতো দেখা হয় না। যোগাযোগও হয়তো কমে গেছে। কিন্তু এই ব্যস্ততার পেছনে আছে একটি স্বপ্ন, আরও কিছু শিশুর হৃদয়ে কুরআনের আলো পৌঁছে দেওয়া। তাই সকল বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী, অভিভাবক ও প্রিয়জনদের কাছে একটাই আবেদন, দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন এই দীর্ঘ পথচলাকে কবুল করেন। যেন কোনো অহংকার না আসে। যেন কোনো ভুলের কারণে কুরআনের খেদমত থেকে বঞ্চিত না হই। যেন জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত কুরআনের সঙ্গে থাকা, কুরআন শেখানো এবং কুরআনের খাদেম হিসেবে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করেন।
একটি মাদরাসা নয়, একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, একটি শিশু যখন প্রথমবার মাদরাসার দরজা দিয়ে প্রবেশ করে, তখন হয়তো সে জানে না সামনে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে। সে জানে না, কত পৃষ্ঠা মুখস্থ করতে হবে। কতবার ভুল করতে হবে। কতবার আবার পড়তে হবে। কতবার উস্তাদের সামনে বসে সংশোধন করতে হবে। সে শুধু জানে, তার হাতে একটি কুরআন আছে। কিন্তু কয়েক বছর পর সেই শিশুই যখন কুরআনের হাফেজ হয়ে বের হবে, তখন তার হাতে থাকবে শুধু একটি সনদ নয়, থাকবে একটি দায়িত্ব।
থাকবে একটি পরিচয়। থাকবে একটি আমানত। আর সেই আমানত যেন তার চরিত্রে ফুটে ওঠে, এটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য। মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসা সেই স্বপ্নেরই একটি নিরন্তর প্রচেষ্টা। এখানে লক্ষ্য শুধু “কতজন হাফেজ হলো ?” তার চেয়েও বড় প্রশ্ন “কতজন ভালো মানুষ হলো?” আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই টঙ্গীর ইসলামপুরের এই প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন নতুন দিনের সূচনা করে। ভোরের নীরবতা ভেদ করে আবার যখন ছোট ছোট কণ্ঠে উচ্চারিত হয়, “আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন…” তখন মনে হয়, এ শুধু একটি শিশুর কণ্ঠ নয়। এ যেন আগামী দিনের একটি প্রজন্মের কণ্ঠ। এ যেন একটি আলোকিত সমাজের স্বপ্ন। এ যেন কুরআনের আলোয় মানুষ গড়ার এক মহাকাব্যিক যাত্রা।

মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসা। ঠিকানা: হাসান লেন, ইসলামপুর (দত্তপাড়া), টঙ্গী, গাজীপুর। ভর্তির জন্য যোগাযোগ: 📞 ০১৯১৪-০৩১০৪১ “শুধু হাফেজ নয়, কুরআনের আলোয় আলোকিত আদর্শ মানুষ গড়াই আমাদের অঙ্গীকার।” আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্তানদের নেককার, কুরআনের হাফেজ, উত্তম চরিত্রের অধিকারী, মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে কবুল করুন। আল্লাহ তাআলা মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসার সকল উস্তাদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের কুরআনের খেদমত কবুল করুন এবং এই প্রতিষ্ঠানকে দ্বীনি শিক্ষা ও মানুষ গড়ার একটি কল্যাণময় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরও এগিয়ে নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

“উস্তাদ পথপ্রদর্শক, অভিভাবক সহযোগী—আর সন্তান আমাদের আমানত”

হিফযের আঙিনা থেকে মানুষ গড়ার মহাকাব্য : কুরআনের অক্ষর মুখস্থ করার পাশাপাশি জীবনকে শুদ্ধ করার এক নিরন্তর প্রয়াস মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসা

আপডেট সময় : ১০:১০:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

টঙ্গীর ইসলামপুর (দত্তপাড়া) এলাকার একটি শান্ত পরিবেশ। ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। চারপাশে দিনের কোলাহল শুরু হওয়ার আগেই কোথাও থেকে ভেসে আসে কুরআন তিলাওয়াতের সুমধুর ধ্বনি। ছোট ছোট কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে আল্লাহর কালাম। কেউ সবক দিচ্ছে, কেউ আগের পড়া ঝালাই করছে, কেউ আবার উস্তাদের সামনে বসে ভুল শুধরে নিচ্ছে।
দৃশ্যটি হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু এই সাধারণ দৃশ্যের আড়ালে চলছে একটি অসাধারণ সংগ্রাম, একজন শিশুকে শুধু হাফেজে কুরআন নয়, বরং একজন সৎ, চরিত্রবান, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সংগ্রাম। এই দীর্ঘ সাধনারই একটি নাম মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসা। হাসান লেন, ইসলামপুর (দত্তপাড়া), টঙ্গী, গাজীপুরে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি হিফয শিক্ষাকে শুধু মুখস্থ করার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে না; বরং এটিকে মনে করে জীবন গঠনের একটি পবিত্র যাত্রা। এখানে একটি শিশুর হাতে শুধু কুরআন তুলে দেওয়া হয় না; তার হৃদয়ে বপন করার চেষ্টা করা হয় ঈমান, তাকওয়া, আদব, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার বীজ। একটি প্রশ্ন, হিফয বিভাগ কার কথায় চলবে ? হিফয বিভাগের পরিচালনা নিয়ে প্রায়ই একটি কথা শোনা যায়, “গার্ডিয়ানের কথায় হিফয বিভাগ চলবে না; বরং উস্তাদের কথার গার্ডিয়ান চলবে।” কথাটির মধ্যে বাস্তবতা থাকলেও বিষয়টি একপাক্ষিকভাবে দেখলে চলবে না। কারণ একটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে উস্তাদ, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর সমন্বিত প্রচেষ্টায়। হিফয বিভাগের মূল দায়িত্ব অবশ্যই উস্তাদের। একজন অভিজ্ঞ ও যোগ্য উস্তাদই বুঝতে পারেন। কোন শিক্ষার্থীকে কতটুকু সবক দেওয়া উচিত, তার আমুখতা ও সাবিনা কীভাবে ঠিক রাখতে হবে, কোথায় সে দুর্বল হচ্ছে এবং কোন পদ্ধতিতে তাকে ধীরে ধীরে একজন সফল হাফেজ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। তাই শিক্ষার পদ্ধতি, পড়ার নিয়ম, সবক, আমুখতা, সাবিনা ও দৈনন্দিন হিফযের শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে উস্তাদের পেশাগত সিদ্ধান্তকে সম্মান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অন্যদিকে অভিভাবকও অপ্রয়োজনীয় নন। একজন বাবা-মা সন্তানের শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক চাপ, পারিবারিক পরিস্থিতি কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো অনেক সময় উস্তাদের চেয়ে ভালো বুঝতে পারেন। তাই অভিভাবকের কথাও শুনতে হবে। তবে সেই মতামত হবে সহযোগিতামূলক, পরিচালনামূলক নয়। অর্থাৎ, উস্তাদ হবেন পথপ্রদর্শক। অভিভাবক হবেন সহযোগী। আর শিক্ষার্থী হবে আমাদের আমানত। এই ভারসাম্যই হতে পারে একটি সফল হিফয বিভাগের ভিত্তি। একটি শিশুর কান্না, আর অভিভাবকের একটি ভুল সিদ্ধান্ত।
ধরা যাক, কোনো একদিন একটি শিশু মাদরাসায় পড়তে চাইছে না। সে কাঁদছে। বলছে, “আম্মু, আমাকে আজ বাসায় নিয়ে যাও।” অভিভাবকের মায়া হচ্ছে। পরিচালকের কাছে ফোন যাচ্ছে, “স্যার, আজকে একটু বাড়ি নিয়ে যাই ?” অনুরোধ, আকুতি, কান্না, শেষ পর্যন্ত হয়তো সন্তানকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হলো। সন্তান তখন একটি ভয়ংকর শিক্ষা শিখে ফেলতে পারে, “আমি কান্না করলেই নিয়ম বদলে যায়।” আজ সে একদিনের জন্য বাড়ি যাবে। কাল সে আরেকটি আবদার করবে। তারপর হয়তো কোনো অনুষ্ঠান, বিয়ে, পারিবারিক আয়োজন কিংবা অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে আবার চলমান ক্লাস থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হবে। একসময় শিশুর মনে প্রতিষ্ঠানের নিয়মের চেয়ে নিজের আবেগের শক্তি বড় হয়ে যেতে পারে। এটি কোনো শিশুর জন্য ভালো শিক্ষা নয়। অভিভাবকের ভালোবাসা সন্তানের জন্য রহমত; কিন্তু অতিরিক্ত প্রশ্রয় কখনো কখনো সেই ভালোবাসাকেই দুর্বলতার জায়গায় নিয়ে যায়। ছুটি মানেই পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্নতা নয়, পারিবারিক অনুষ্ঠান থাকবে। বিয়ে-শাদি থাকবে। আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া থাকবে। সামাজিক দায়িত্বও থাকবে। কিন্তু চেষ্টা হওয়া উচিত, এসব আয়োজন যেন মাদরাসার নির্ধারিত ছুটির সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে করা যায়।
কারণ হিফযের শিক্ষা অন্য অনেক শিক্ষার মতো নয়। একদিনের অনিয়ম কখনো কখনো কয়েক দিনের পড়ার ছন্দ নষ্ট করে দিতে পারে। একজন শিক্ষার্থী নিয়মিত সবক দিচ্ছে, আমুখতা করছে, সাবিনা ঠিক রাখছে, হঠাৎ কয়েকদিনের জন্য রুটিন ভেঙে গেল। বাড়িতে গিয়ে দীর্ঘ সময় আরাম, ঘুম, মোবাইল, বিনোদন ও পারিবারিক ব্যস্ততায় থাকল। ফিরে এসে অনেক সময় তার মন আর আগের জায়গায় থাকে না। তাই প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মানা শুধু মাদরাসার সুবিধার জন্য নয়; সন্তানের নিজের ভবিষ্যতের জন্যও প্রয়োজন। কেন সন্তান ছুটি কাটিয়ে মাদরাসায় ফিরতে চায় না ? এ প্রশ্ন অনেক অভিভাবকের। এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।
মাদরাসায় জীবন নিয়মতান্ত্রিক। নামাজ, তিলাওয়াত, সবক, আমুখতা, পড়াশোনা, বিশ্রাম, সবকিছুর একটি নির্দিষ্ট সময় আছে। অন্যদিকে বাড়িতে দীর্ঘ ছুটিতে শিশুটি হয়তো পেয়ে যায় বেশি আরাম, বেশি ঘুম, বেশি বিনোদন, বেশি স্বাধীনতা। ফলে নিয়মের জীবনে ফিরে আসা তার কাছে কঠিন মনে হতে পারে। এখানে অভিভাবকের দায়িত্ব হলো সন্তানকে বোঝানো। কষ্ট মানেই খারাপ কিছু নয়। জীবনে ধৈর্য শিখতে হয়। অপেক্ষা করতে হয়। কখনো নিজের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কখনো প্রিয় জিনিস থেকে বিরত থাকতে হয়। এই শিক্ষা শিশুর ভবিষ্যৎ চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সব আবদার পূরণ করা ভালোবাসা নয়। আজকের পৃথিবীতে অনেক বাবা-মা সন্তানের কোনো চাওয়া অপূর্ণ রাখতে চান না।
সন্তান কিছু চাইলো, দিয়ে দিলেন। আরেকটি চাইলো, সেটিও দিয়ে দিলেন। আবার কিছু চাইলো, সেটিও পূরণ হলো। কিন্তু জীবনের একটি কঠিন সত্য হলো, যে শিশু সবকিছু সহজে পেয়ে যায়, সে অনেক সময় অপেক্ষা করতে শেখে না। আর যে অপেক্ষা করতে জানে না, সে ধৈর্য শিখতে পারে না। যে ধৈর্য শিখতে পারে না, সে জীবনের কঠিন পরীক্ষার সামনে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সন্তানকে কখনো কখনো সীমাবদ্ধতার শিক্ষা দেওয়া দরকার। তাকে বোঝাতে হবে সব চাওয়া সঙ্গে সঙ্গে পূরণ হয় না।
কিছু জিনিসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কিছু জিনিস অর্জন করতে পরিশ্রম করতে হয়। কিছু আনন্দ ত্যাগ করে বড় স্বপ্নের দিকে এগোতে হয়। এটাই জীবন।
প্রথম দশ বছর, জীবন গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সন্তান স্কুলে পড়ুক কিংবা মাদরাসায়, শৈশব ও কৈশোরের প্রথম দিকের বছরগুলো তার চরিত্র গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে সে যা দেখে, যা শেখে এবং যে অভ্যাস তৈরি করে, তার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত যায়। তাই অভিভাবক যদি প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ভাঙাকে প্রশ্রয় দেন, সন্তানের প্রতিটি আবদারে নিয়ম পরিবর্তন করে দেন কিংবা পড়াশোনার চেয়ে সাময়িক আনন্দকে বেশি গুরুত্ব দেন, তাহলে অজান্তেই সন্তানের ভবিষ্যৎ গঠনে নেতিবাচক ভূমিকা তৈরি হতে পারে। অভিভাবকের দায়িত্ব শুধু সন্তানকে প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে দেওয়া নয়। ভর্তি করানোর পরও দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং তখনই শুরু হয় নতুন দায়িত্ব, উস্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া, নিয়ম মানতে উৎসাহ দেওয়া, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা এবং অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা।
১৮ জুলাই ২০২৬ একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। এই চিন্তা ও দায়িত্ববোধ থেকেই ১৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসায় ছাত্রদের পড়াশোনার মানোন্নয়ন ও হিফয বিভাগের কার্যক্রম নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান আরও উন্নত করা, হিফযের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, উস্তাদদের দায়িত্ব আরও সুসংগঠিত করা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা। একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নতি শুধু বড় ভবন দিয়ে হয় না। উন্নতি হয়, ভালো শিক্ষক,
সুশৃঙ্খল পদ্ধতি, যোগ্য নেতৃত্ব, অভিভাবকের সহযোগিতা। এবং শিক্ষার্থীর আন্তরিক প্রচেষ্টায়। মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসার এই বৈঠক সেই ধারাবাহিক প্রচেষ্টারই একটি অংশ। ২১ বছরের মেহনত, একজন খাদেমের নীরব গল্প। হিফয বিভাগের খেদমতের সঙ্গে দীর্ঘ ২১ বছর ধরে যুক্ত থেকে একজন খাদেমের জীবনও যেন একটি আলাদা গল্প।
এই দীর্ঘ সময়ে কত শত শিশুর সঙ্গে দেখা হয়েছে। কেউ দ্রুত কুরআন মুখস্থ করেছে। কেউ ধীরে এগিয়েছে। কেউ বারবার ভুল করেছে। কেউ হতাশ হয়েছে। কেউ আবার একদিন হঠাৎ এমনভাবে এগিয়ে গেছে যে তার উস্তাদরাও আনন্দে অভিভূত হয়েছেন। কেউ আজ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। কেউ হয়তো দূরে। কেউ এখনো উস্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। আবার কারও সঙ্গে হয়তো দীর্ঘদিন দেখা নেই। কিন্তু একজন কুরআনের শিক্ষক বা খাদেমের কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার হয়তো কোনো পদ-পদবি নয়।
একদিন কোনো প্রাক্তন ছাত্র এসে যদি বলে, “উস্তাদ, আপনার কাছে কুরআন শিখেছিলাম, আজও ভুলিনি।” তখন তার চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে ? বন্ধুবান্ধবের কাছে দূরত্ব, কিন্তু কুরআনের কাছে আরও কাছে। হিফয বিভাগের খেদমতের এই দীর্ঘ পথচলায় ব্যস্ততা বাড়ছে। কাছের-দূরের অনেক বন্ধু, প্রিয়জন ও পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ কিংবা যোগাযোগ কমে যাচ্ছে। কিন্তু এই দূরত্ব কোনো অবহেলার কারণে নয়। এটি একটি দায়িত্বের ব্যস্ততা। কারণ কুরআনের খেদমত এমন এক দায়িত্ব, যেখানে সময়ের হিসাব সবসময় ঘড়ির কাঁটায় হয় না। একটি শিশুর ভুল সংশোধন করতে হয়। একটি দুর্বল সবক আবার শুনতে হয়। একজন মন খারাপ করা শিক্ষার্থীকে সাহস দিতে হয়। কখনো কঠোর হতে হয়। কখনো ভালোবাসতে হয়। কখনো বোঝাতে হয়। কখনো অপেক্ষা করতে হয়। এইভাবেই দিন যায়। মাস যায়। বছর যায়। আর একদিন পেছনে তাকালে দেখা যায়, ২১ বছর কেটে গেছে। “ঈমান মদিনার দিকে ফিরে যাবে” একটি গভীর বার্তা। রাসুলুল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয়ই ঈমান মদিনার দিকে ফিরে যাবে, যেমন সাপ তার গর্তের দিকে ফিরে যায়।” এটি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ হাদিস; সহিহ বুখারি ১৮৭৬-এ এবং সহিহ মুসলিমে অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। এই হাদিস আমাদের সামনে একটি গভীর শিক্ষা তুলে ধরে, ফিতনা ও পরীক্ষার সময়ে ঈমানের প্রতি ফিরে আসা, দ্বীনের প্রতি দৃঢ় থাকা এবং আল্লাহর পথে অবিচল থাকা কত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের শিশুদের যদি কুরআনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, নামাজের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, আদব-আখলাকের শিক্ষা দেওয়া যায়, তাহলে তারা শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য নয়, জীবনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্যও প্রস্তুত হবে।
অপপ্রচার নয়, প্রয়োজন সত্যকে জানার। বর্তমান সময়ে কওমি ও দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা, সমালোচনা ও প্রচারণা দেখা যায়। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তা যাচাই হওয়া উচিত। তবে একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে কোনো কথা ছড়িয়ে পড়লেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি কোনো অভিযোগ থাকলে তা যাচাই না করে উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক নয়। সত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো স্বচ্ছতা। মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসার লক্ষ্য তাই বিতর্কে জড়ানো নয়। লক্ষ্য হলো,
শিক্ষার মান উন্নত করা। উস্তাদদের সমন্বয় বাড়ানো। অভিভাবকদের সচেতন করা। শিক্ষার্থীদের সুন্দরভাবে গড়ে তোলা। এবং কুরআনের খেদমতকে আরও এগিয়ে নেওয়া।
এখানে হিফয মানে শুধু মুখস্থ করা নয়। একজন ছাত্র কুরআন মুখস্থ করল, এটাই কি শেষ ? না। তার আচরণ কেমন ? সে পিতা-মাতাকে সম্মান করে কি না ? উস্তাদকে সম্মান করে কি না ? সত্য কথা বলে কি না ? নামাজের প্রতি যত্নশীল কি না ? ছোটদের ভালোবাসে কি না ? নিজের দায়িত্ব বোঝে কি না ? সমাজের প্রতি তার দায়িত্ববোধ আছে কি না?
কুরআনের আলো যদি তার মুখস্থের মধ্যে থাকে, কিন্তু আচরণে তার প্রতিফলন না ঘটে, তাহলে শিক্ষার পূর্ণতা কোথায় ?
তাই মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসার স্বপ্ন, কুরআনের হাফেজের পাশাপাশি আদর্শ মানুষ তৈরি করা। কুরআনের পাখিদের জন্য আনন্দও আছে শুধু পড়াশোনা, নিয়ম আর শাসন নয়। শিশুর শৈশবও গুরুত্বপূর্ণ। তাই খেলাধুলা, ফুটবল প্রতিযোগিতা, বিভিন্ন আয়োজন, পুরস্কার বিতরণী এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আনন্দময় পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ঈদুল আজহা উপলক্ষে আয়োজিত ফুটবল প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে যখন পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়, তখন তাদের মুখের হাসি যেন বলে দেয়, কুরআনের আঙিনাতেও শৈশব হাসতে জানে। একজন শিশুর হাতে একদিকে কুরআন, অন্যদিকে খেলাধুলার আনন্দ, এই সমন্বয়ই তাকে ভারসাম্যপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
উস্তাদ ও অভিভাবক, দুই হাত এক হলে শিশুর ভবিষ্যৎ শক্ত হয়। একটি শিশুকে একা উস্তাদ গড়ে তুলতে পারেন না। আবার শুধু অভিভাবকের পক্ষেও সবকিছু সম্ভব নয়।
উস্তাদ জানেন শিক্ষার পথ। অভিভাবক জানেন সন্তানের ঘরের জীবন। উস্তাদ দেখেন তার পড়া। অভিভাবক দেখেন তার আচরণ। উস্তাদ তাকে শৃঙ্খলা শেখান। অভিভাবক সেই শৃঙ্খলাকে ঘরেও বাস্তবায়ন করেন। দুই পক্ষের মধ্যে যদি সন্দেহ থাকে, শিশু বিভ্রান্ত হয়। দুই পক্ষের মধ্যে যদি দ্বন্দ্ব থাকে, শিশু সুযোগ নিতে শেখে। কিন্তু দুই পক্ষের মধ্যে যদি আস্থা থাকে, তাহলে একটি শিশু ধীরে ধীরে একজন সুন্দর মানুষ হয়ে ওঠে।
অভিভাবকদের প্রতি হৃদয়ের আহ্বান। প্রিয় অভিভাবক, আপনি আপনার সন্তানকে যখন মাদরাসায় ভর্তি করান, তখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে তাকে পাঠান না। আপনি তাকে একটি পরিবেশের হাতে তুলে দেন। তাই, অপ্রয়োজনীয়ভাবে চলমান ক্লাস থেকে সন্তানকে নিয়ে যাবেন না। সন্তানের কান্নাকে সবসময় সিদ্ধান্তের কারণ বানাবেন না। প্রতিষ্ঠানের নিয়মকে সম্মান করুন। উস্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। সন্তানের শারীরিক বা মানসিক কোনো সমস্যা থাকলে উস্তাদকে জানান। ঘরেও পড়ার পরিবেশ তৈরি করুন।
সব চাওয়া সঙ্গে সঙ্গে পূরণ না করে ধৈর্য ও সংযম শেখান। মনে রাখবেন, আজ আপনি যে সামান্য শৃঙ্খলা সন্তানের ওপর প্রয়োগ করছেন, আগামীকাল সেটিই তার চরিত্রের শক্তি হতে পারে।
একটি প্রতিষ্ঠানকে চিনবেন কীভাবে ? একটি প্রতিষ্ঠানকে শুধু তার ভবন দিয়ে চিনবেন না। দেখুন, সেখানে শিক্ষকরা কেমন ? শিক্ষার্থীরা কেমন ? শৃঙ্খলা কেমন ? অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ কেমন ? শিক্ষার্থীর চরিত্রে কী পরিবর্তন আসছে ? কুরআনের পাশাপাশি তার আচরণে কি ইসলামের সৌন্দর্য ফুটে উঠছে ? কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচয় তার দেয়ালে লেখা নাম নয়। তার ছাত্রদের চরিত্রই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। মুসলিহুল উম্মাহর স্বপ্ন, আজকের শিশু, আগামীর আলোকিত প্রজন্ম, এই প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন শুধু শত শত হাফেজ তৈরি করা নয়। স্বপ্ন আরও বড়। এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা কুরআন জানবে। কুরআন ভালোবাসবে। কুরআনের আদর্শে জীবন পরিচালনার চেষ্টা করবে। পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্বশীল হবে। উস্তাদকে সম্মান করবে। সততাকে ভালোবাসবে। দেশ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করবে। মানুষের পাশে দাঁড়াবে। এবং যেখানে যাবে, সেখানেই একজন মুসলমানের উত্তম চরিত্রের পরিচয় বহন করবে। আপনার সন্তানের জন্য আজকের সিদ্ধান্তই হতে পারে আগামী দিনের পরিচয়। প্রত্যেক বাবা-মা চান তার সন্তান ভালো মানুষ হোক। কেউ চান ডাক্তার হোক। কেউ চান ইঞ্জিনিয়ার হোক। কেউ চান ব্যবসায়ী হোক। কেউ চান প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী হোক।
কিন্তু সব স্বপ্নের আগে একটি স্বপ্ন থাকা উচিত, আমার সন্তান একজন ভালো মানুষ হোক। কারণ পেশা মানুষকে পরিচয় দিতে পারে। কিন্তু চরিত্র মানুষকে সম্মান এনে দেয়। আর সেই চরিত্র গঠনের সময় হলো শৈশব। আজকের একটি সঠিক সিদ্ধান্ত আগামী দিনের জীবনকে বদলে দিতে পারে। দূর থেকে যে প্রতিষ্ঠানকে চিনবে মানুষ। টঙ্গীর ইসলামপুরের একটি প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন আজ শুধু একটি এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার নয়।
স্বপ্ন হলো, একদিন মানুষ দূর থেকে নাম শুনেই বলবে, “মুসলিহুল উম্মাহ ? ওটা সেই প্রতিষ্ঠান, যেখানে শুধু হাফেজ তৈরি হয় না মানুষও তৈরি হয়।” যেখানে উস্তাদরা শুধু পড়ান না গড়েন। যেখানে অভিভাবকরা শুধু সন্তানকে রেখে যান না শিক্ষকদের সঙ্গে পথচলা শিখেন। যেখানে শিশুরা শুধু কুরআন মুখস্থ করে না, কুরআনের আদর্শে জীবন গড়ার প্রাথমিক শিক্ষা নেয়। যেখানে শৃঙ্খলা আছে, কিন্তু ভালোবাসাও আছে। যেখানে কঠোরতা আছে, কিন্তু মানবিকতাও আছে। যেখানে পড়াশোনা আছে, আবার শিশুর হাসিও আছে। যেখানে হিফয আছে, আবার মানুষ হওয়ার স্বপ্নও আছে।
২১ বছরের খেদমত থেকে একটি প্রার্থনা। হিফয বিভাগের খেদমতের দীর্ঘ ২১ বছরের পথচলায় আজও একটি আকাঙ্ক্ষাই সবচেয়ে বড়, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কুরআনের খেদমত করে যেতে চাই। বন্ধুবান্ধব, প্রিয়জন, শুভাকাঙ্ক্ষী, সবার সঙ্গে হয়তো আগের মতো দেখা হয় না। যোগাযোগও হয়তো কমে গেছে। কিন্তু এই ব্যস্ততার পেছনে আছে একটি স্বপ্ন, আরও কিছু শিশুর হৃদয়ে কুরআনের আলো পৌঁছে দেওয়া। তাই সকল বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী, অভিভাবক ও প্রিয়জনদের কাছে একটাই আবেদন, দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন এই দীর্ঘ পথচলাকে কবুল করেন। যেন কোনো অহংকার না আসে। যেন কোনো ভুলের কারণে কুরআনের খেদমত থেকে বঞ্চিত না হই। যেন জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত কুরআনের সঙ্গে থাকা, কুরআন শেখানো এবং কুরআনের খাদেম হিসেবে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করেন।
একটি মাদরাসা নয়, একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, একটি শিশু যখন প্রথমবার মাদরাসার দরজা দিয়ে প্রবেশ করে, তখন হয়তো সে জানে না সামনে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে। সে জানে না, কত পৃষ্ঠা মুখস্থ করতে হবে। কতবার ভুল করতে হবে। কতবার আবার পড়তে হবে। কতবার উস্তাদের সামনে বসে সংশোধন করতে হবে। সে শুধু জানে, তার হাতে একটি কুরআন আছে। কিন্তু কয়েক বছর পর সেই শিশুই যখন কুরআনের হাফেজ হয়ে বের হবে, তখন তার হাতে থাকবে শুধু একটি সনদ নয়, থাকবে একটি দায়িত্ব।
থাকবে একটি পরিচয়। থাকবে একটি আমানত। আর সেই আমানত যেন তার চরিত্রে ফুটে ওঠে, এটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য। মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসা সেই স্বপ্নেরই একটি নিরন্তর প্রচেষ্টা। এখানে লক্ষ্য শুধু “কতজন হাফেজ হলো ?” তার চেয়েও বড় প্রশ্ন “কতজন ভালো মানুষ হলো?” আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই টঙ্গীর ইসলামপুরের এই প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন নতুন দিনের সূচনা করে। ভোরের নীরবতা ভেদ করে আবার যখন ছোট ছোট কণ্ঠে উচ্চারিত হয়, “আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন…” তখন মনে হয়, এ শুধু একটি শিশুর কণ্ঠ নয়। এ যেন আগামী দিনের একটি প্রজন্মের কণ্ঠ। এ যেন একটি আলোকিত সমাজের স্বপ্ন। এ যেন কুরআনের আলোয় মানুষ গড়ার এক মহাকাব্যিক যাত্রা।

মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসা। ঠিকানা: হাসান লেন, ইসলামপুর (দত্তপাড়া), টঙ্গী, গাজীপুর। ভর্তির জন্য যোগাযোগ: 📞 ০১৯১৪-০৩১০৪১ “শুধু হাফেজ নয়, কুরআনের আলোয় আলোকিত আদর্শ মানুষ গড়াই আমাদের অঙ্গীকার।” আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্তানদের নেককার, কুরআনের হাফেজ, উত্তম চরিত্রের অধিকারী, মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে কবুল করুন। আল্লাহ তাআলা মুসলিহুল উম্মাহ হিফজ মাদরাসার সকল উস্তাদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের কুরআনের খেদমত কবুল করুন এবং এই প্রতিষ্ঠানকে দ্বীনি শিক্ষা ও মানুষ গড়ার একটি কল্যাণময় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরও এগিয়ে নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।