ঢাকা ০২:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সন্ত্রাস-নৈরাজ্যের প্রতিবাদে দিন-রাত রাজপথে বিএনপি ৮৪-এর তরুণ: এথেন্সের মঞ্চে বাংলাদেশের লাল-সবুজের স্বর্ণগাথা পরিকল্পিত নৈরাজ্যের প্রতিবাদে তাঁতীদলের সমাবেশ ও মিছিল টঙ্গীর রাজপথে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল পদ-পদবীর মোহ নয় মানুষের ভালোবাসাই যার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির বার্তা দিলেন সভাপতি তাজুল ইসলাম বেপারী সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে টঙ্গীর রাজপথে বিএনপির বিক্ষোভ মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপই হবে ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ভিত্তি- সোহেল চৌধুরী ময়লা দেখলেই থেমে যান, হাতে তুলে নেন পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব টঙ্গীর রাজপথে সুমন-টিপুর নেতৃত্বে যুবদলের বিক্ষোভ

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মজিবুর রহমানের জীবনের আরেকটি মহাকাব্যিক অধ্যায় পদকের সঙ্গে যুক্ত হলো মানুষের ভালোবাসা ও সম্মানের গল্প

৮৪-এর তরুণ: এথেন্সের মঞ্চে বাংলাদেশের লাল-সবুজের স্বর্ণগাথা

md younus
  • আপডেট সময় : ০১:০৫:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ১৫৯১ বার পড়া হয়েছে




এথেন্সে স্বর্ণজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মজিবুর রহমানের সঙ্গে সংসদ সদস্য এম. মঞ্জুরুল করিম রনি। আন্তরিক সম্মান ও ভালোবাসায় স্মরণীয় হলো বিশ্বজয়ী ক্রীড়াবিদের এই সাক্ষাৎ।
কেউ কেউ বয়সের কাছে থেমে যান, আবার কেউ কেউ বয়সকে সঙ্গে নিয়েই ইতিহাসের পথে হাঁটেন। কেউ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বিশ্রাম খোঁজেন, আর কেউ তখনও স্বপ্ন দেখেন দেশের পতাকাকে আরও একবার বিশ্বের মঞ্চে তুলে ধরার। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মজিবুর রহমান যেন সেই দ্বিতীয় গল্পের মানুষ। ৮৪ বছর বয়স, যে বয়সে অধিকাংশ মানুষ জীবনের অর্জনগুলো স্মরণ করে সময় কাটান, সেই বয়সেই মজিবুর রহমান হাতে তুলে নিয়েছেন ভারোত্তোলনের বার। বুকের ভেতর ধারণ করেছেন লাল-সবুজের পতাকা। চোখে রেখেছেন দেশের সম্মান। আর পরিশ্রম, সাহস ও অদম্য মানসিক শক্তিকে সঙ্গী করে পাড়ি দিয়েছেন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের কঠিন পথ।
এথেন্সে যখন বাজল বিজয়ের সুর, গ্রিসের ঐতিহাসিক নগরী এথেন্স। বিশ্ব ক্রীড়ার ইতিহাসে যার রয়েছে অনন্য স্থান। সেই এথেন্সের মাটিতেই World Masters & Adaptive Weightlifting Championships 2026-এ ১৭ সেপ্টেম্বর অংশগ্রহণ করে স্বর্ণপদক অর্জন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মজিবুর রহমান। একজন প্রবীণ ক্রীড়াবিদের হাতে যখন স্বর্ণপদক ওঠে, তখন সেই পদকের ওজন শুধু গ্রাম বা কেজিতে মাপা যায় না। তার সঙ্গে মিশে থাকে বছরের পর বছর অনুশীলনের ঘাম, অসংখ্য দিনের ত্যাগ, শরীরের ক্লান্তিকে জয় করার গল্প এবং দেশের পতাকার প্রতি গভীর ভালোবাসা। এথেন্সের মঞ্চে তাঁর এই অর্জন তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়া একটি অনুপ্রেরণার অধ্যায়।
পদকের গল্প শুরু হয়নি এথেন্সে, মজিবুর রহমানের সাফল্যের গল্প এথেন্স থেকে শুরু হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ক্রীড়া-জীবন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, অধ্যবসায় এবং বয়সকে অতিক্রম করে নিজেকে নতুনভাবে প্রমাণ করার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। ২০২৫ সালেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক এবং লাস ভেগাস বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে রৌপ্যপদক অর্জনের পর এবার এথেন্সে যোগ হলো আরেকটি স্বর্ণপদক। একটির পর একটি পদক যেন বলে দেয়, বয়স তাঁর কাছে কোনো দেয়াল নয়; বরং প্রতিটি নতুন বছর তাঁর কাছে নতুন চ্যালেঞ্জ।
দেশে ফেরার পর আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়, এথেন্সের বিজয় শেষে দেশে ফিরে মজিবুর রহমানের সাক্ষাৎ হয় গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম. মঞ্জুরুল করিম রনি-র সঙ্গে। সাক্ষাতের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, তাঁকে দেখে এম. মঞ্জুরুল করিম রনি আন্তরিকভাবে বলেন, “আপনি শুধু গাজীপুরের গর্ব নন, আপনি সারা বাংলাদেশের গর্ব।” একজন ক্রীড়াবিদের কাছে এমন স্বীকৃতির মূল্য অনেক। কারণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের জন্য অর্জন করা পদক যেমন সম্মানের, তেমনি দেশের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসাও একজন ক্রীড়াবিদের পথচলার অন্যতম শক্তি। মজিবুর রহমানের ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক সাফল্যের কথাও স্মরণ করেন এম. মঞ্জুরুল করিম রনি। ৮৪ বছর বয়সে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক অর্জনের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানান তিনি।
একটি ক্লাব, একটি স্বপ্ন, একটি প্রজন্ম, সাক্ষাতের সময় গাজীপুরে একটি ভারোত্তোলন ক্লাব গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়। মজিবুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন এম. মঞ্জুরুল করিম রনি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ক্লাবটি পরিদর্শনের আগ্রহও প্রকাশ করেছেন তিনি। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এর গুরুত্ব শুধু একটি ক্রীড়া ক্লাব প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। একজন বিশ্বজয়ী প্রবীণ ক্রীড়াবিদের অভিজ্ঞতা যদি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে একটি প্রজন্ম শিখতে পারে, চ্যাম্পিয়ন হওয়া শুধু শক্তির বিষয় নয়; এর সঙ্গে প্রয়োজন শৃঙ্খলা, ধৈর্য, সততা ও দীর্ঘ সাধনা। একটি ভারোত্তোলন ক্লাব হয়তো তৈরি করবে নতুন ক্রীড়াবিদ। কিন্তু মজিবুর রহমানের জীবন তৈরি করতে পারে নতুন স্বপ্ন।
পদকের বাইরেও যে মানবিকতা, এই সাক্ষাতের সবচেয়ে আবেগঘন স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে আছে আতিথেয়তার মুহূর্তটি। দুপুরে এম. মঞ্জুরুল করিম রনির দপ্তরে গিয়ে মজিবুর রহমান তাঁর কাছ থেকে আন্তরিক আপ্যায়ন পেয়েছেন। তাঁর কাছে এটি কেবল খাবার খাওয়ানো নয়; একজন প্রবীণ ক্রীড়াবিদের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও মানবিকতার প্রকাশ। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা একজন মানুষের কাছে কখনো কখনো বড় উপহারের প্রয়োজন হয় না। কয়েকটি আন্তরিক কথা, সামান্য সম্মান, একটি উষ্ণ অভ্যর্থনা, এসবই হয়ে ওঠে স্মৃতির অমূল্য সম্পদ। মজিবুর রহমানের হৃদয়ে তাই এ সাক্ষাৎ শুধু একজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে তাঁর ক্রীড়া-জীবনের স্মরণীয় একটি মানবিক অধ্যায়।
মুক্তিযোদ্ধা থেকে বিশ্বজয়ী ক্রীড়াবিদ, মজিবুর রহমানের পরিচয় শুধু একজন ভারোত্তোলক হিসেবে নয়। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। একসময় দেশের স্বাধীনতার জন্য যে প্রজন্ম জীবন বাজি রেখেছিল, সেই প্রজন্মের একজন মানুষ আজও দেশের নাম উজ্জ্বল করতে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে লড়াই করছেন, এ দৃশ্য নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণাদায়ক। এক হাতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, অন্য হাতে ভারোত্তোলনের বার, দুটি ভিন্ন সময়ের দুটি সংগ্রাম যেন তাঁর জীবনে এসে এক জায়গায় মিলেছে। একটি সংগ্রাম ছিল স্বাধীন দেশের জন্য। আরেকটি সংগ্রাম দেশের পতাকাকে বিশ্বের ক্রীড়া মঞ্চে সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরার জন্য।
ধর্ম, দেশপ্রেম আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা, মজিবুর রহমানের এই পথচলার মধ্যে রয়েছে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও কৃতজ্ঞতার অনুভূতি। তাঁর অর্জনকে তিনি শুধু নিজের কৃতিত্ব হিসেবে দেখেন না; পরিবার, শুভাকাঙ্ক্ষী, সহযোদ্ধা ও দেশের মানুষের ভালোবাসাকেও তিনি এই যাত্রার অংশ মনে করেন। ইসলামের শিক্ষা মানুষকে পরিশ্রম, ধৈর্য, শৃঙ্খলা, ন্যায় ও মানুষের কল্যাণের পথে চলতে উৎসাহিত করে। সেই মূল্যবোধের আলোকে একজন ক্রীড়াবিদের সাফল্য তখনই আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তাঁর অর্জন পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। তাই এথেন্সের স্বর্ণপদক শুধু একটি অর্জন নয়, এটি যেন একটি আহ্বান: স্বপ্ন দেখো। পরিশ্রম করো। দেশকে ভালোবাসো। বয়সকে ভয় পেয়ো না। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো।


একজন মানুষের কৃতজ্ঞতা, এম. মঞ্জুরুল করিম রনির আন্তরিকতা ও সহযোগিতার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মজিবুর রহমান। তাঁর প্রার্থনা, আল্লাহ যেন এম. মঞ্জুরুল করিম রনিকে সুস্থ রাখেন, মানুষের সেবায় কাজ করার তৌফিক দান করেন এবং দেশের ক্রীড়া অঙ্গন ও তরুণ প্রজন্মের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ দেন। একজন জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে পাওয়া সম্মান একজন ক্রীড়াবিদের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি একজন প্রবীণ ক্রীড়াবিদের অভিজ্ঞতাকে নতুন প্রজন্মের কাজে লাগানোর উদ্যোগ হতে পারে ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় সম্পদ।
শেষ হয় না যে গল্প, এথেন্সে স্বর্ণপদক জয়ের দিনটি হয়তো ইতিহাসের একটি তারিখ হয়ে থাকবে। কিন্তু মজিবুর রহমানের গল্প সেখানে শেষ নয়। কারণ একজন সত্যিকারের ক্রীড়াবিদের সবচেয়ে বড় বিজয় শুধু প্রতিযোগিতার মঞ্চে নয়, তাঁর জীবন যখন অন্য কাউকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়, তখনই সেই বিজয় পূর্ণতা পায়। ৮৪ বছর বয়সে তাঁর হাতে ওঠা স্বর্ণপদক তাই যেন সময়কে দেওয়া এক জবাব, বয়স শরীরের হতে পারে, স্বপ্নের নয়। বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা যখন তাঁর হাতে উড়েছে, তখন এথেন্সের মাটিতে শুধু একজন মজিবুর রহমান দাঁড়াননি, দাঁড়িয়েছিল তাঁর দেশ, তাঁর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, তাঁর দীর্ঘ সাধনা এবং নতুন প্রজন্মের জন্য এক অমলিন অনুপ্রেরণা। আল্লাহ তাঁর অর্জনকে কবুল করুন, তাঁকে সুস্থতা ও দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন এবং তাঁর হাত ধরে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে আরও নতুন স্বপ্নের জন্ম হোক, এই প্রার্থনাই থাকুক। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মজিবুর রহমান, ৮৪ বছরের এক তরুণ, যার হাতে আজও বাংলাদেশের পতাকা, চোখে নতুন স্বপ্ন, আর হৃদয়ে অমলিন দেশপ্রেম।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মজিবুর রহমানের জীবনের আরেকটি মহাকাব্যিক অধ্যায় পদকের সঙ্গে যুক্ত হলো মানুষের ভালোবাসা ও সম্মানের গল্প

৮৪-এর তরুণ: এথেন্সের মঞ্চে বাংলাদেশের লাল-সবুজের স্বর্ণগাথা

আপডেট সময় : ০১:০৫:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এথেন্সে স্বর্ণজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মজিবুর রহমানের সঙ্গে সংসদ সদস্য এম. মঞ্জুরুল করিম রনি। আন্তরিক সম্মান ও ভালোবাসায় স্মরণীয় হলো বিশ্বজয়ী ক্রীড়াবিদের এই সাক্ষাৎ।
কেউ কেউ বয়সের কাছে থেমে যান, আবার কেউ কেউ বয়সকে সঙ্গে নিয়েই ইতিহাসের পথে হাঁটেন। কেউ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বিশ্রাম খোঁজেন, আর কেউ তখনও স্বপ্ন দেখেন দেশের পতাকাকে আরও একবার বিশ্বের মঞ্চে তুলে ধরার। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মজিবুর রহমান যেন সেই দ্বিতীয় গল্পের মানুষ। ৮৪ বছর বয়স, যে বয়সে অধিকাংশ মানুষ জীবনের অর্জনগুলো স্মরণ করে সময় কাটান, সেই বয়সেই মজিবুর রহমান হাতে তুলে নিয়েছেন ভারোত্তোলনের বার। বুকের ভেতর ধারণ করেছেন লাল-সবুজের পতাকা। চোখে রেখেছেন দেশের সম্মান। আর পরিশ্রম, সাহস ও অদম্য মানসিক শক্তিকে সঙ্গী করে পাড়ি দিয়েছেন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের কঠিন পথ।
এথেন্সে যখন বাজল বিজয়ের সুর, গ্রিসের ঐতিহাসিক নগরী এথেন্স। বিশ্ব ক্রীড়ার ইতিহাসে যার রয়েছে অনন্য স্থান। সেই এথেন্সের মাটিতেই World Masters & Adaptive Weightlifting Championships 2026-এ ১৭ সেপ্টেম্বর অংশগ্রহণ করে স্বর্ণপদক অর্জন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মজিবুর রহমান। একজন প্রবীণ ক্রীড়াবিদের হাতে যখন স্বর্ণপদক ওঠে, তখন সেই পদকের ওজন শুধু গ্রাম বা কেজিতে মাপা যায় না। তার সঙ্গে মিশে থাকে বছরের পর বছর অনুশীলনের ঘাম, অসংখ্য দিনের ত্যাগ, শরীরের ক্লান্তিকে জয় করার গল্প এবং দেশের পতাকার প্রতি গভীর ভালোবাসা। এথেন্সের মঞ্চে তাঁর এই অর্জন তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়া একটি অনুপ্রেরণার অধ্যায়।
পদকের গল্প শুরু হয়নি এথেন্সে, মজিবুর রহমানের সাফল্যের গল্প এথেন্স থেকে শুরু হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ক্রীড়া-জীবন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, অধ্যবসায় এবং বয়সকে অতিক্রম করে নিজেকে নতুনভাবে প্রমাণ করার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। ২০২৫ সালেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক এবং লাস ভেগাস বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে রৌপ্যপদক অর্জনের পর এবার এথেন্সে যোগ হলো আরেকটি স্বর্ণপদক। একটির পর একটি পদক যেন বলে দেয়, বয়স তাঁর কাছে কোনো দেয়াল নয়; বরং প্রতিটি নতুন বছর তাঁর কাছে নতুন চ্যালেঞ্জ।
দেশে ফেরার পর আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়, এথেন্সের বিজয় শেষে দেশে ফিরে মজিবুর রহমানের সাক্ষাৎ হয় গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম. মঞ্জুরুল করিম রনি-র সঙ্গে। সাক্ষাতের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, তাঁকে দেখে এম. মঞ্জুরুল করিম রনি আন্তরিকভাবে বলেন, “আপনি শুধু গাজীপুরের গর্ব নন, আপনি সারা বাংলাদেশের গর্ব।” একজন ক্রীড়াবিদের কাছে এমন স্বীকৃতির মূল্য অনেক। কারণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের জন্য অর্জন করা পদক যেমন সম্মানের, তেমনি দেশের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসাও একজন ক্রীড়াবিদের পথচলার অন্যতম শক্তি। মজিবুর রহমানের ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক সাফল্যের কথাও স্মরণ করেন এম. মঞ্জুরুল করিম রনি। ৮৪ বছর বয়সে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক অর্জনের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানান তিনি।
একটি ক্লাব, একটি স্বপ্ন, একটি প্রজন্ম, সাক্ষাতের সময় গাজীপুরে একটি ভারোত্তোলন ক্লাব গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়। মজিবুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন এম. মঞ্জুরুল করিম রনি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ক্লাবটি পরিদর্শনের আগ্রহও প্রকাশ করেছেন তিনি। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এর গুরুত্ব শুধু একটি ক্রীড়া ক্লাব প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। একজন বিশ্বজয়ী প্রবীণ ক্রীড়াবিদের অভিজ্ঞতা যদি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে একটি প্রজন্ম শিখতে পারে, চ্যাম্পিয়ন হওয়া শুধু শক্তির বিষয় নয়; এর সঙ্গে প্রয়োজন শৃঙ্খলা, ধৈর্য, সততা ও দীর্ঘ সাধনা। একটি ভারোত্তোলন ক্লাব হয়তো তৈরি করবে নতুন ক্রীড়াবিদ। কিন্তু মজিবুর রহমানের জীবন তৈরি করতে পারে নতুন স্বপ্ন।
পদকের বাইরেও যে মানবিকতা, এই সাক্ষাতের সবচেয়ে আবেগঘন স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে আছে আতিথেয়তার মুহূর্তটি। দুপুরে এম. মঞ্জুরুল করিম রনির দপ্তরে গিয়ে মজিবুর রহমান তাঁর কাছ থেকে আন্তরিক আপ্যায়ন পেয়েছেন। তাঁর কাছে এটি কেবল খাবার খাওয়ানো নয়; একজন প্রবীণ ক্রীড়াবিদের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও মানবিকতার প্রকাশ। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা একজন মানুষের কাছে কখনো কখনো বড় উপহারের প্রয়োজন হয় না। কয়েকটি আন্তরিক কথা, সামান্য সম্মান, একটি উষ্ণ অভ্যর্থনা, এসবই হয়ে ওঠে স্মৃতির অমূল্য সম্পদ। মজিবুর রহমানের হৃদয়ে তাই এ সাক্ষাৎ শুধু একজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে তাঁর ক্রীড়া-জীবনের স্মরণীয় একটি মানবিক অধ্যায়।
মুক্তিযোদ্ধা থেকে বিশ্বজয়ী ক্রীড়াবিদ, মজিবুর রহমানের পরিচয় শুধু একজন ভারোত্তোলক হিসেবে নয়। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। একসময় দেশের স্বাধীনতার জন্য যে প্রজন্ম জীবন বাজি রেখেছিল, সেই প্রজন্মের একজন মানুষ আজও দেশের নাম উজ্জ্বল করতে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে লড়াই করছেন, এ দৃশ্য নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণাদায়ক। এক হাতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, অন্য হাতে ভারোত্তোলনের বার, দুটি ভিন্ন সময়ের দুটি সংগ্রাম যেন তাঁর জীবনে এসে এক জায়গায় মিলেছে। একটি সংগ্রাম ছিল স্বাধীন দেশের জন্য। আরেকটি সংগ্রাম দেশের পতাকাকে বিশ্বের ক্রীড়া মঞ্চে সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরার জন্য।
ধর্ম, দেশপ্রেম আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা, মজিবুর রহমানের এই পথচলার মধ্যে রয়েছে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও কৃতজ্ঞতার অনুভূতি। তাঁর অর্জনকে তিনি শুধু নিজের কৃতিত্ব হিসেবে দেখেন না; পরিবার, শুভাকাঙ্ক্ষী, সহযোদ্ধা ও দেশের মানুষের ভালোবাসাকেও তিনি এই যাত্রার অংশ মনে করেন। ইসলামের শিক্ষা মানুষকে পরিশ্রম, ধৈর্য, শৃঙ্খলা, ন্যায় ও মানুষের কল্যাণের পথে চলতে উৎসাহিত করে। সেই মূল্যবোধের আলোকে একজন ক্রীড়াবিদের সাফল্য তখনই আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তাঁর অর্জন পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। তাই এথেন্সের স্বর্ণপদক শুধু একটি অর্জন নয়, এটি যেন একটি আহ্বান: স্বপ্ন দেখো। পরিশ্রম করো। দেশকে ভালোবাসো। বয়সকে ভয় পেয়ো না। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো।


একজন মানুষের কৃতজ্ঞতা, এম. মঞ্জুরুল করিম রনির আন্তরিকতা ও সহযোগিতার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মজিবুর রহমান। তাঁর প্রার্থনা, আল্লাহ যেন এম. মঞ্জুরুল করিম রনিকে সুস্থ রাখেন, মানুষের সেবায় কাজ করার তৌফিক দান করেন এবং দেশের ক্রীড়া অঙ্গন ও তরুণ প্রজন্মের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ দেন। একজন জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে পাওয়া সম্মান একজন ক্রীড়াবিদের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি একজন প্রবীণ ক্রীড়াবিদের অভিজ্ঞতাকে নতুন প্রজন্মের কাজে লাগানোর উদ্যোগ হতে পারে ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় সম্পদ।
শেষ হয় না যে গল্প, এথেন্সে স্বর্ণপদক জয়ের দিনটি হয়তো ইতিহাসের একটি তারিখ হয়ে থাকবে। কিন্তু মজিবুর রহমানের গল্প সেখানে শেষ নয়। কারণ একজন সত্যিকারের ক্রীড়াবিদের সবচেয়ে বড় বিজয় শুধু প্রতিযোগিতার মঞ্চে নয়, তাঁর জীবন যখন অন্য কাউকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়, তখনই সেই বিজয় পূর্ণতা পায়। ৮৪ বছর বয়সে তাঁর হাতে ওঠা স্বর্ণপদক তাই যেন সময়কে দেওয়া এক জবাব, বয়স শরীরের হতে পারে, স্বপ্নের নয়। বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা যখন তাঁর হাতে উড়েছে, তখন এথেন্সের মাটিতে শুধু একজন মজিবুর রহমান দাঁড়াননি, দাঁড়িয়েছিল তাঁর দেশ, তাঁর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, তাঁর দীর্ঘ সাধনা এবং নতুন প্রজন্মের জন্য এক অমলিন অনুপ্রেরণা। আল্লাহ তাঁর অর্জনকে কবুল করুন, তাঁকে সুস্থতা ও দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন এবং তাঁর হাত ধরে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে আরও নতুন স্বপ্নের জন্ম হোক, এই প্রার্থনাই থাকুক। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মজিবুর রহমান, ৮৪ বছরের এক তরুণ, যার হাতে আজও বাংলাদেশের পতাকা, চোখে নতুন স্বপ্ন, আর হৃদয়ে অমলিন দেশপ্রেম।