রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতার চেয়েও বড়—একটি রাষ্ট্রের ইতিহাস, একটি জাতির প্রত্যাশা
রাষ্ট্রের শীর্ষে দুই অধ্যায়, ইতিহাসের বাঁকে বাংলাদেশ
- আপডেট সময় : ১২:৪১:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৬১১ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান ও সরকারের নির্বাহী প্রধান, দুই ভিন্ন দায়িত্বে দুই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পরিণতি।
বাংলাদেশের ইতিহাস কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস নয়। এটি মানুষের ভোট, গণআন্দোলন, রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংবিধানিক পরিবর্তন, ত্যাগ, প্রত্যাশা এবং নেতৃত্বের দীর্ঘ পরীক্ষার ইতিহাস। একটি রাষ্ট্র কখনো একদিনে তৈরি হয় না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে বহু প্রজন্মের অভিজ্ঞতায়, গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় মানুষের অংশগ্রহণে, আর নেতৃত্বের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় সময়ের বিচারে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালের সংবিধান সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করে। এরপরের পাঁচ দশকে বাংলাদেশ দেখেছে সামরিক শাসন, গণঅভ্যুত্থান, সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন, রাজনৈতিক মেরুকরণ, নির্বাচন, আন্দোলন এবং নতুন নতুন নেতৃত্বের উত্থান। ২০২৬ সালের আগস্টে এসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে যুক্ত হয়েছে এক নতুন অধ্যায়।
একদিকে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে, তারেক রহমান জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দুই ব্যক্তি। দুই রাজনৈতিক পথচলা। দুই ভিন্ন সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু একই রাষ্ট্র-বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের ইতিহাসের দীর্ঘ পথ, বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করেছে। আবার প্রতিটি নতুন নেতৃত্বকে সময়ের কাছে জবাবদিহিও করতে হয়েছে। ২০২৬ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। প্রথম অধ্যায়, কর্মী থেকে নেতা, তারেক রহমান, তৃণমূলের একজন কর্মী থেকে জাতীয় নেতৃত্বের শীর্ষে, এক দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার ইতিহাস, রাজনীতির শীর্ষে পৌঁছানোর পথ কখনো একদিনে তৈরি হয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, রাজনৈতিক সংগ্রাম, মাঠপর্যায়ের কাজ এবং সময়ের কঠিন পরীক্ষা। তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনও শুরু হয়েছিল তৃণমূলের একজন কর্মী হিসেবে। পরবর্তীতে নির্বাচনী রাজনীতি, দলীয় সংগঠন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং জাতীয় পর্যায়ের দায়িত্ব অতিক্রম করে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে পৌঁছান। ২০২৬ সালে জাতীয় নির্বাচনের পর তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর এই যাত্রা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়।

১৯৮৮ — তৃণমূল থেকে সূচনা, দলীয় ইতিহাস অনুযায়ী ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। এই সূচনার বিশেষত্ব ছিল একটি বিষয়, তিনি কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে নয়, একজন সাধারণ দলীয় কর্মী হিসেবে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেন। তৃণমূলের সংগঠন, স্থানীয় নেতাকর্মী এবং মাঠপর্যায়ের রাজনীতির অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তাঁর নেতৃত্বের ভিত্তি তৈরি করে বলে বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়।
১৯৯১ — নির্বাচনী রাজনীতির মাঠে, ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। এই নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনী প্রচারণায় তারেক রহমান সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচারণা, সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে আরও বিস্তৃত করে। ২০০১, সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা, ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। দলীয় সংগঠন শক্তিশালী করা, নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে পরিচিত হতে শুরু করেন। এই সময় থেকেই তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ২০০২, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ২০০২ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব লাভ করেন। এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কারণ একজন তৃণমূল কর্মী থেকে তিনি এবার কেন্দ্রীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। দলীয় রাজনীতি, সাংগঠনিক বিস্তার এবং জাতীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা আরও গভীর হয়। ২০০৯, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে ২০০৯ সালে তারেক রহমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্নে এই পদটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় থেকে বিএনপির রাজনৈতিক কাঠামোয় তিনি অন্যতম প্রধান নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। ২০১৮, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, ২০১৮ সালে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করেও দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক কৌশল, আন্দোলন ও নীতিগত সিদ্ধান্তে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি ছিল নেতৃত্বের এক নতুন বাস্তবতা, দূরত্বে থেকেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পরিচালনা। ২০২৬, — প্রধানমন্ত্রী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিপুল বিজয় অর্জনের পর তারেক রহমান সরকার গঠনের দায়িত্ব পান। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এই শপথের মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার নতুন অধ্যায় শুরু হয়, দলীয় নেতৃত্ব থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার নির্বাহী দায়িত্বে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও এটিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক পথচলা এক নজরে, “কর্মী থেকে নেতা—নেতা থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে।” এই বাক্যের মধ্যেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সারসংক্ষেপ খুঁজে পাওয়া যায়। তবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মূল্যায়ন কখনো পদ দিয়ে হয় না। হয় দায়িত্ব দিয়ে।

দীর্ঘ সংগ্রাম থেকে রাষ্ট্রপ্রধান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, একজন শিক্ষক, একজন সংসদ সদস্য, একজন দলীয় মহাসচিব, অবশেষে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত নাম। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে ছিল শিক্ষকতার জীবন। অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। পরবর্তীতে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ধীরে ধীরে বিএনপির জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় নেতা এবং এক দশকেরও বেশি সময় বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায় সূচিত হয়।
শিক্ষকতা থেকে রাজনীতি, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কর্মজীবনের শুরু ছিল শিক্ষা পেশায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি অধ্যয়ন করেন এবং পরবর্তীতে শিক্ষক হিসেবে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, সংযত বক্তব্য এবং আলোচনাভিত্তিক নেতৃত্ব ধীরে ধীরে তাঁকে জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করে।
সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভা, ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার এই অধ্যায় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকে। বিএনপির দুঃসময়ের কাণ্ডারি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরোধী রাজনীতির দীর্ঘ সময় বিএনপির জন্য ছিল অত্যন্ত কঠিন। এই সময়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র ও সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজপথের আন্দোলন, রাজনৈতিক সংলাপ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দলের অবস্থান তুলে ধরা এবং নেতাকর্মীদের সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও তাঁকে দীর্ঘদিনের বিরোধী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
২০২৬ — রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাস, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হয়। পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০ আগস্ট ২০২৬ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ওলি আহমেদ পান ৮৮ ভোট। এই নির্বাচন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এটি বহু বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হিসেবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পায়।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা, সাংবিধানিক মর্যাদা এবং জাতীয় প্রতিনিধিত্বের প্রতীক। একই সঙ্গে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হলেও দেশের নির্বাহী ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পৃথক হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় উভয় পদই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দুই নেতার দুই দীর্ঘ পথ, তারেক রহমান, তৃণমূলের কর্মী থেকে প্রধানমন্ত্রী, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম থেকে রাষ্ট্রপ্রধান দুই নেতার রাজনৈতিক জীবন একই সময়ে বিকশিত হলেও তাঁদের দায়িত্বের ধরন ভিন্ন। তারেক রহমানের রাজনৈতিক পথ মূলত সংগঠন নির্মাণ, দলীয় নেতৃত্ব এবং নির্বাহী সরকার পরিচালনার দিকে অগ্রসর হয়েছে। অন্যদিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পথ শিক্ষকতা, সংসদীয় রাজনীতি, দলীয় কূটনীতি, সংগঠনিক নেতৃত্ব এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধানের দায়িত্বে পৌঁছেছে।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী: দুই সাংবিধানিক স্তম্ভ, বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী একই ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী নন; বরং সংবিধান নির্ধারিত দুটি পৃথক দায়িত্বের ধারক।
রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। প্রধানমন্ত্রী সরকারের নির্বাহী প্রধান। রাষ্ট্রের মর্যাদা, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বের প্রতীক রাষ্ট্রপতি; আর জনগণের নির্বাচিত সরকারের নীতি বাস্তবায়ন, প্রশাসন পরিচালনা ও মন্ত্রিসভার নেতৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব। এই ভারসাম্যই সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
২০২৬: একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ একটি অন্তর্বর্তী সময় অতিক্রম করে। পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জনগণের ভোটে নতুন সরকার গঠিত হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
এর কয়েক মাস পর রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন আসে। ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের ভোটে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এই দুই ঘটনা একই বছরের মধ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তন হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয়। একটি পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বাস্তবতা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম। তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেন। পরবর্তীতে তাঁর সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একাধিকবার সরকার পরিচালনা করেন।
এই রাজনৈতিক পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমান পরবর্তীতে বিএনপির নেতৃত্বে উঠে এসে ২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হন। তবে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কোনো ব্যক্তিগত উত্তরাধিকারের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না; গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের ভোট, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমেই রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব নির্ধারিত হয়। এই সত্যই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
ইতিহাসের আয়নায় সময়রেখা, এই সময়রেখা দেখায়, বাংলাদেশের ইতিহাস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তন পূর্ববর্তী অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। ইতিহাস এখনো লেখা শেষ হয়নি। ইতিহাস কখনো কোনো নেতাকে শুধু তাঁর পদ দিয়ে মূল্যায়ন করে না। ইতিহাস মূল্যায়ন করে, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা, গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার সক্ষমতা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবিক রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টা, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে দায়িত্ব রাষ্ট্রের সাংবিধানিক মর্যাদা রক্ষা করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে দায়িত্ব জনগণের প্রত্যাশাকে বাস্তব রাষ্ট্রনীতিতে রূপ দেওয়া। দুই দায়িত্বের পথ আলাদা। কিন্তু গন্তব্য একটাই। একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও উন্নত বাংলাদেশ। রাষ্ট্রের শীর্ষে দুই অধ্যায়।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বাংলাদেশের রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নির্বাহী প্রধান, একটি রাষ্ট্র। একটি সংবিধান। একটি ইতিহাস। নেতৃত্ব বদলায়, সময় বদলায়, প্রজন্ম বদলায়।
কিন্তু ইতিহাস সবসময় একটি প্রশ্ন রেখে যায়, ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো কতটা বড় অর্জন, আর সেই ক্ষমতাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা কতটা বড় দায়িত্ব ? এই প্রশ্নের উত্তরই লিখবে আগামী দিনের বাংলাদেশ।













