হামলা-মামলা, জেল-জুলুম আর আত্মগোপনের দিনগুলো যারা পেরিয়েছেন, রাজনৈতিক মূল্যায়নে তাদের ত্যাগ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে ?
ত্যাগীদের মূল্যায়ন কোথায় ? দলীয় নেতৃত্বের কাছে বেনজীর রহমান খাঁন পিন্টুর প্রশ্ন
- আপডেট সময় : ১২:৪৮:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৫৭৯ বার পড়া হয়েছে

রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন সময়েই একজন কর্মীর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়। সুদিনে পাশে দাঁড়ানো সহজ, কিন্তু প্রতিকূল সময়ে দলের পতাকা ধরে রাখা, মামলা-হামলার ভয় উপেক্ষা করে রাজপথে থাকা কিংবা পরিবার ও নিজের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে রেখে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া, সেই পরীক্ষাই একজন রাজনৈতিক কর্মীর ত্যাগের প্রকৃত মানদণ্ড।
এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছেন গাজীপুর মহানগর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক, টঙ্গী পূর্ব থানা বিএনপির যুব বিষয়ক সম্পাদক এবং টঙ্গী পূর্ব থানা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. বেনজীর রহমান খাঁন পিন্টু।
সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি দলীয় নেতৃত্বের প্রতি তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে বিগত সময়ের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, হামলা-মামলা, নির্যাতন, আত্মগোপন এবং রাজপথের আন্দোলনে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ভূমিকার কথা। ‘যারা পালায়নি, তারাই তো রাজপথ ধরে রেখেছিল’ পিন্টুর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি হলো, দুঃসময়ে দলের জন্য যারা নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে রেখেছিলেন, আজ তাদের রাজনৈতিক অবস্থান কী ? তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বিগত সরকারের সময় অনেক পরীক্ষিত নেতাকর্মী হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের কারণে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিলেন। কেউ বিদেশে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন, আবার কেউ নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবারের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় বা আপসকামী অবস্থানে ছিলেন, এমন অভিযোগ তৃণমূলের মধ্যে রয়েছে।
অন্যদিকে, অনেক নেতাকর্মী দেশেই থেকে নিজেদের পরিচয় গোপন করে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। কেউ দিনমজুরি করেছেন, কেউ রিকশা চালিয়েছেন, কেউ ফুটপাতে ছোট দোকান করেছেন। কেউ ধান-পাটের ক্ষেতে রাত কাটিয়েছেন, আবার কেউ রিকশার গ্যারেজে ঘুমিয়েও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন।
তাঁর বক্তব্যে প্রশ্নটি তাই খুব সরল, দুঃসময়ে যারা দলের জন্য সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন, সুসময়ে তাদের জায়গা কোথায় ? আন্দোলনের ইতিহাস কি শুধু বিজয়ের দিনের ইতিহাস ? একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস কেবল চূড়ান্ত বিজয়ের দিনের ঘটনা দিয়ে লেখা যায় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, নির্যাতন সহ্য করা মানুষ, কারাবন্দি নেতাকর্মী, আত্মগোপনে থাকা কর্মী এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সংগ্রাম করা অসংখ্য মানুষের গল্প।
বেনজীর রহমান খাঁন পিন্টুর বক্তব্যে সেই অদৃশ্য মানুষগুলোর কথাই সামনে এসেছে। তিনি মনে করেন, আন্দোলনের কঠিন সময়ে যারা রাজপথে ছিলেন, তাদের অবদানকে রাজনৈতিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ একটি দলের সাংগঠনিক শক্তি শুধু পদ-পদবি কিংবা অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; বরং দুঃসময়ে দলের জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করা হয়েছে, সেটিও নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও তৃণমূলের অবদান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। তবে সেই পরিবর্তনের পেছনে দীর্ঘদিনের আন্দোলন, প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা ছিল। পিন্টুর বক্তব্যের মূল সুর হলো, এই দীর্ঘ সংগ্রামের তৃণমূল পর্যায়ের অংশগ্রহণকারীদের ভুলে গেলে চলবে না। যারা কোনো চাপকে চাপ মনে করেননি, হুমকিকে হুমকি মনে করেননি এবং নিজেদের নিরাপত্তার কথা না ভেবে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে থেকেছেন, তাদের অবদানও ইতিহাসের অংশ। তাঁর প্রশ্ন, আজ তাদের নিয়ে দলীয় নেতৃত্ব কী ভাবছে ?
‘হাইব্রিড’ রাজনীতি নিয়ে তৃণমূলের অস্বস্তি, নিজের বক্তব্যে পিন্টু ‘হাইব্রিড’ নেতাকর্মীদের প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তৃণমূলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি ধারণা রয়েছে যে, দল ক্ষমতায় গেলে অনেক সময় সুবিধাজনক সময়ে সামনে আসা ব্যক্তিরা দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। এই প্রবণতা যদি সত্যিই থাকে, তাহলে তা দলের জন্য দীর্ঘমেয়াদে কতটা ইতিবাচক, সেই প্রশ্নও তিনি সামনে এনেছেন। তবে তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে কোনো ব্যক্তিকে হেয় করা নয়; বরং ত্যাগ বনাম সুবিধাবাদ, এই দুইয়ের পার্থক্য দলীয় মূল্যায়নে স্পষ্ট করার আহ্বান। ‘সাদা কে সাদা, কালো কে কালো বলুন’ ফেসবুক পোস্টের শেষদিকে দলীয় নেতৃত্বের প্রতি অত্যন্ত সরাসরি আহ্বান জানিয়েছেন বেনজীর রহমান খাঁন পিন্টু।
তাঁর বক্তব্যের সারকথা, নেতৃত্বকে এখনই সঠিক ও ন্যায়সংগত মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কে দুঃসময়ে ছিলেন, কে দলের জন্য ত্যাগ করেছেন, কে আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন এবং কে কঠিন সময়ে দূরে ছিলেন, এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই সাংগঠনিক মূল্যায়ন করা উচিত। তাঁর সেই বক্তব্যের একটি প্রতীকী আহ্বান হয়ে উঠেছে, “সাদা কে সাদা বলুন, কালো কে কালো বলুন।” অর্থাৎ দলীয় স্বার্থে সত্যকে সত্য হিসেবে স্বীকার করার সাহস থাকতে হবে। এতে ব্যক্তি নয়, বরং দলই শক্তিশালী হবে, এমন প্রত্যাশাই তাঁর বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। তৃণমূলের নীরব প্রশ্ন, ত্যাগের কি কোনো মূল্য আছে? রাজনীতিতে পদ পাওয়া এক বিষয়, আর সেই পদের মর্যাদা অর্জন করা আরেক বিষয়। পদ-পদবি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে; কিন্তু দুঃসময়ের ত্যাগের ইতিহাস সহজে মুছে যায় না।
তৃণমূলের সেই নীরব প্রশ্নই যেন নিজের বক্তব্যে উচ্চারণ করেছেন বেনজীর রহমান খাঁন পিন্টু, যে কর্মী দুঃসময়ে দলের পাশে ছিল, তার মূল্যায়ন কি সুসময়ে হবে না ? রাজনৈতিক দল তখনই শক্তিশালী হয়, যখন ত্যাগী কর্মীরা বিশ্বাস করেন, তাদের ত্যাগ একদিন মূল্যায়িত হবে। আর যখন সেই বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যায়, তখন সাংগঠনিক ভিতও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
নেতৃত্বের জন্য এখনই সিদ্ধান্তের সময়, বেনজীর রহমান খাঁন পিন্টুর বক্তব্য তাই কেবল একটি ফেসবুক পোস্ট হিসেবে দেখলে হয়তো এর গভীরতা পুরোপুরি ধরা পড়বে না। এর ভেতরে রয়েছে তৃণমূলের বহুদিনের একটি প্রশ্ন, দলের দুঃসময়ের সৈনিকদের ভবিষ্যৎ কোথায় ?
রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি তাঁর বার্তা স্পষ্ট, অতীতের ত্যাগকে মূল্যায়ন করুন, তৃণমূলের কর্মীদের কথা শুনুন এবং যোগ্যতা ও পরীক্ষিত ভূমিকার ভিত্তিতে নেতৃত্বের জায়গা নির্ধারণ করুন। কারণ ক্ষমতা কিংবা পদ ক্ষণস্থায়ী হতে পারে; কিন্তু দুঃসময়ে দলের পাশে থাকার ইতিহাসই একজন কর্মীর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিচয়। আর সেই ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার করতে পারলেই দল আরও সুসংগঠিত, ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, এটাই তাঁর বক্তব্যের মূল প্রত্যাশা।














