রাজপথের নির্যাতিত, ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মী মোছাম্মদ বুলবুলির না বলা গল্প
দুর্দিনের সেই সৈনিক কি আজও অপেক্ষায়?
- আপডেট সময় : ০৯:০৫:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
- / ১৫৯৩ বার পড়া হয়েছে

রাজনীতির ইতিহাসে কিছু নাম থাকে আলোয়, আবার কিছু নাম থাকে আড়ালে। কিন্তু ইতিহাস যখন সত্যিকারের ত্যাগের হিসাব করে, তখন আড়ালের মানুষগুলোকেই সামনে নিয়ে আসে। গাজীপুরের টঙ্গীর এরশাদনগর ৪৯নং ওয়ার্ডের ৩নং ব্লকের বাসিন্দা মোছাম্মদ বুলবুলি তেমনই এক নাম। তিনি হয়তো বড় কোনো পদে নেই, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতেও নন; কিন্তু বিএনপির দুর্দিনের রাজপথে তাঁর পদচিহ্ন আজও স্পষ্ট।
বুঝ হওয়ার পর থেকেই বিএনপির আদর্শকে বুকে ধারণ করে মহিলা দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তিনি। বর্তমানে তিনি ৪৯নং ওয়ার্ড মহিলা দলের প্রচার সম্পাদিকা এবং থানা মহিলা দলের একজন সক্রিয় সদস্য। যখন বিএনপির নাম উচ্চারণ করাও অনেকের জন্য ভয়ের বিষয় ছিল, যখন মিছিল মানেই ছিল মামলা, হামলা, গ্রেফতার ও নির্যাতন সেই সময়ে মোছাম্মদ বুলবুলি ছিলেন রাজপথে। পুলিশের ধাওয়া, লাঠিচার্জ, গুলির শব্দ কিংবা কারাগারের ভয় তাঁকে থামাতে পারেনি।
তাঁর বড় ছেলে রাজনৈতিক কারণে বছরের পর বছর কারাভোগ করেছেন। সংসারে অভাব ছিল, কষ্ট ছিল, অনিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু বিএনপির প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি একচুলও পিছিয়ে যাননি।
একটি ছোট ফল ও কাঁচামালের ব্যবসা তাঁর জীবিকার উৎস। সেই সামান্য আয়ের টাকায় সংসার চলে, চিকিৎসা চলে, সন্তানদের প্রয়োজন মেটে। অথচ সেই আয়ের একটি অংশ তিনি আজও ব্যয় করেন দলের জন্য। মিটিং-মিছিলে যাওয়ার সময় নিজের পকেটের টাকা খরচ করে কর্মীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করেন। কোনো অসহায় কর্মী ভাড়া দিতে না পারলে নিজেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। অনেক সময় নিজের প্রয়োজনকে পিছনে রেখে দলের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
শীতের কনকনে রাত, ভোরের অন্ধকার কিংবা গভীর রাতের ফেরার পথ কোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি। কখনো ৫০০ টাকা ভাড়া দিয়ে অটোরিকশা নিয়ে নিজে গেছেন, আবার সঙ্গে নিয়ে গেছেন অন্য কর্মীদেরও। ঢাকায় বিএনপির বড় বড় সমাবেশ, আন্দোলন ও কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। কঠোর তল্লাশি ও বাধা উপেক্ষা করে ট্রেনে চড়ে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে তাঁর জীবনে।
একদিন তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “দল থেকে তো আপনি কিছুই পান না। তাহলে এত কষ্ট করে এখনো কেন দল করেন?” মোছাম্মদ বুলবুলির উত্তর ছিল অত্যন্ত সহজ, কিন্তু হৃদয়স্পর্শী- “আমি দল থেকে কিছু পাওয়ার জন্য রাজনীতি করি না। বিএনপি আমার ভালোবাসা, আমার বিশ্বাস, আমার আত্মার অংশ। দল আমাকে কিছু না দিলেও আমি দলের জন্য কাজ করবো। যতদিন বেঁচে থাকবো, বিএনপির সাথেই থাকবো।” এই একটি বাক্যই যেন তাঁর পুরো রাজনৈতিক জীবনের সারসংক্ষেপ।
আজ বিএনপি আরও শক্তিশালী, আরও সংগঠিত। নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে, নতুন কর্মী যুক্ত হচ্ছে। এটি অবশ্যই আনন্দের বিষয়। কিন্তু একই সঙ্গে দুর্দিনের পরীক্ষিত, ত্যাগী এবং নির্যাতিত কর্মীদের খোঁজ নেওয়াও দলের নৈতিক দায়িত্ব। মোছাম্মদ বুলবুলি কোনো পদ চান না, কোনো ব্যক্তিগত সুবিধাও চান না। তিনি শুধু চান, দল যেন তাঁকে ভুলে না যায়। যেই দলের জন্য তিনি জীবনের মূল্যবান সময়, শ্রম, অর্থ এবং পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য উৎসর্গ করেছেন, সেই দল যেন তাঁকে একজন আপনজন হিসেবে মনে রাখে।
বিএনপির নীতিনির্ধারক, কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, গাজীপুর মহানগর ও টঙ্গী অঞ্চলের সম্মানিত নেতৃত্বের প্রতি বিনীত অনুরোধ দুর্দিনের এই ত্যাগী নারী কর্মীর মতো মানুষদের খোঁজ নিন। তাঁদের পাশে দাঁড়ান। তাঁদের সম্মান দিন। কারণ সংগঠনের প্রকৃত শক্তি শুধু মঞ্চের সামনে নয়, বরং সেইসব নীরব যোদ্ধাদের মধ্যে নিহিত, যারা প্রতিদানের আশা না করেই একটি পতাকাকে বুকে ধারণ করে জীবন কাটিয়ে দেন।
মোছাম্মদ বুলবুলির গল্প শুধু একজন নারীর গল্প নয়; এটি বিএনপির দুর্দিনের সংগ্রামের গল্প, ত্যাগের গল্প, ভালোবাসার গল্প এবং আদর্শের প্রতি অবিচল আনুগত্যের এক অনন্য দলিল। হয়তো একদিন কোনো নেতা এই লেখাটি পড়বেন, এবং মনে করবেন দলের জন্য এত কিছু করা মানুষগুলোর খবর নেওয়াও তো আমাদের দায়িত্ব। সেদিনই এই লেখার সার্থকতা।

















