ঢাকা ০৭:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে নাশকতা প্রতিরোধে মাঠে বিএনপি, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় নেতৃত্বে নয়ন এমপি ও শওকত হোসেন সরকার রিফাত-জুম্মনকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে উত্তাল এরশাদনগর রাজপথের পরীক্ষিত কর্মী বেনজীর রহমান খান পিন্টু পদ-পদবির অহংকার নয়, মানুষের সেবাই কাজী হুমায়ূন কবিরের রাজনীতির মূল দর্শন মানুষের পাশে থাকা, সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে হাজী আব্দুল জব্বার সরকার ফল বিক্রির সামান্য আয়, তবুও দলের কর্মসূচিতে নিজের উপার্জন ব্যয় মাদকবিরোধী অবস্থানে আপসহীন আবুল হোসেন খলিফা, মামলা নিয়ে প্রশ্ন রাজনীতিতে আদর্শ, জীবনে কুরআনের আলো হাফেজ কারী মাইনুদ্দিনের স্বপ্ন মানুষ গড়ার মন্ত্রীদের নিয়ে বিশেষ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মানুষের পাশে থাকার প্রত্যয়, অপপ্রচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আলহাজ্ব মনোয়ার হোসেন খোকন

স্বামীর পাশে সমাহিত ‘আপসহীন নেত্রী’ খালেদা জিয়া

md younus
  • আপডেট সময় : ১২:৪১:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ২২০৩ বার পড়া হয়েছে




বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের পর্দা নামল। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেল সাড়ে চারটার পর রাজধানীর জিয়া উদ্যানে, স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। এর আগে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতিতে রাজধানীজুড়ে তৈরি হয় শোকের জনসমুদ্র।
বিকেল তিনটার পর সংসদ ভবনের মাঠ ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ঘিরে অনুষ্ঠিত জানাজায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ অংশ নেন। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক জানাজা পড়ান। জানাজার আগে মুসল্লি ও দেশবাসীর কাছে দোয়া চান বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, “আমার মা যদি কারো কাছে কোনো ঋণ রেখে গিয়ে থাকেন, অনুগ্রহ করে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমরা তা পরিশোধের ব্যবস্থা করব।” একই সঙ্গে তার মায়ের কোনো আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা করে দেওয়ার আবেদন জানান তিনি।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, তিন বাহিনীর প্রধান, বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ বিভিন্ন দলের নেতারাও অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাবিক, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এন ধুঙ্গেল, মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতির উচ্চ শিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী আলি হায়দার আহমেদ, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, চীন, ইরান, কাতারসহ ৩২টি দেশের কূটনীতিক জানাজায় উপস্থিত থেকে শ্রদ্ধা জানান।
জানাজা শেষে বিকেল চারটার দিকে মরদেহবাহী গাড়ি জিয়া উদ্যানে পৌঁছায়। সেখানে সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এরপর পরিবারের সদস্য, দলীয় নেতা-কর্মী ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে দাফন সম্পন্ন হয়।
ভোর থেকেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও আশপাশের এলাকায় মানুষের ঢল নামে। সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতা-কর্মীরা বলেন, গৃহবধূ থেকে দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পথচলা ছিল সংগ্রাম ও জনপ্রিয়তায় ভরা। দীর্ঘ প্রায় চার দশকের রাজনীতিতে তিনি গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের প্রশ্নে যে অবস্থান নিয়েছিলেন, তার শেষ বিদায়ে সেই ভালোবাসাই যেন রাজপথে উপচে পড়েছে।
এই মানিক মিয়া অ্যাভেনিউতেই ১৯৮১ সালের ২ জুন খালেদা জিয়ার স্বামী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজা হয়েছিল। পরে তাকে সমাহিত করা হয় চন্দ্রিমা উদ্যানে, যার বর্তমান নাম জিয়া উদ্যান।
১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হয় খালেদা জিয়ার।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমান ছিলেন ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এবং জেড ফোর্সের অধিনায়ক। মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য স্বাধীনতার পর তাকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়। পরে নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে তিনি ক্ষমার শীর্ষে পৌঁছান।
তিনি রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন।
জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির হাল ধরেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া, তখন তিনি নিতান্তই একজন গৃহবধূ। তিনি ১৯৮৪ সালের অগাস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন, আমৃত্যু তিনি সে দায়িত্বে ছিলেন।
১৯৮৩ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সাতদলীয় জোট গঠন করে এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু করে। সেই আন্দোলনে এরশাদ সরকারের সঙ্গে কখনো আপস করেননি খালেদা।
অন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতা করলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি কোনো সমঝোতায় যায়নি। তাই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার নাম হয় আপসহীন নেত্রী।
দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, ফুসফুস, লিভার, কিডনি ও ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতায় ভুগে মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ছয়টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী অধ্যায়ের অবসান হলো।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

স্বামীর পাশে সমাহিত ‘আপসহীন নেত্রী’ খালেদা জিয়া

আপডেট সময় : ১২:৪১:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের পর্দা নামল। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেল সাড়ে চারটার পর রাজধানীর জিয়া উদ্যানে, স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। এর আগে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতিতে রাজধানীজুড়ে তৈরি হয় শোকের জনসমুদ্র।
বিকেল তিনটার পর সংসদ ভবনের মাঠ ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ঘিরে অনুষ্ঠিত জানাজায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ অংশ নেন। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক জানাজা পড়ান। জানাজার আগে মুসল্লি ও দেশবাসীর কাছে দোয়া চান বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, “আমার মা যদি কারো কাছে কোনো ঋণ রেখে গিয়ে থাকেন, অনুগ্রহ করে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমরা তা পরিশোধের ব্যবস্থা করব।” একই সঙ্গে তার মায়ের কোনো আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা করে দেওয়ার আবেদন জানান তিনি।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, তিন বাহিনীর প্রধান, বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ বিভিন্ন দলের নেতারাও অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাবিক, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এন ধুঙ্গেল, মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতির উচ্চ শিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী আলি হায়দার আহমেদ, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, চীন, ইরান, কাতারসহ ৩২টি দেশের কূটনীতিক জানাজায় উপস্থিত থেকে শ্রদ্ধা জানান।
জানাজা শেষে বিকেল চারটার দিকে মরদেহবাহী গাড়ি জিয়া উদ্যানে পৌঁছায়। সেখানে সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এরপর পরিবারের সদস্য, দলীয় নেতা-কর্মী ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে দাফন সম্পন্ন হয়।
ভোর থেকেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও আশপাশের এলাকায় মানুষের ঢল নামে। সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতা-কর্মীরা বলেন, গৃহবধূ থেকে দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পথচলা ছিল সংগ্রাম ও জনপ্রিয়তায় ভরা। দীর্ঘ প্রায় চার দশকের রাজনীতিতে তিনি গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের প্রশ্নে যে অবস্থান নিয়েছিলেন, তার শেষ বিদায়ে সেই ভালোবাসাই যেন রাজপথে উপচে পড়েছে।
এই মানিক মিয়া অ্যাভেনিউতেই ১৯৮১ সালের ২ জুন খালেদা জিয়ার স্বামী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজা হয়েছিল। পরে তাকে সমাহিত করা হয় চন্দ্রিমা উদ্যানে, যার বর্তমান নাম জিয়া উদ্যান।
১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হয় খালেদা জিয়ার।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমান ছিলেন ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এবং জেড ফোর্সের অধিনায়ক। মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য স্বাধীনতার পর তাকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়। পরে নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে তিনি ক্ষমার শীর্ষে পৌঁছান।
তিনি রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন।
জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির হাল ধরেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া, তখন তিনি নিতান্তই একজন গৃহবধূ। তিনি ১৯৮৪ সালের অগাস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন, আমৃত্যু তিনি সে দায়িত্বে ছিলেন।
১৯৮৩ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সাতদলীয় জোট গঠন করে এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু করে। সেই আন্দোলনে এরশাদ সরকারের সঙ্গে কখনো আপস করেননি খালেদা।
অন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতা করলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি কোনো সমঝোতায় যায়নি। তাই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার নাম হয় আপসহীন নেত্রী।
দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, ফুসফুস, লিভার, কিডনি ও ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতায় ভুগে মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ছয়টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী অধ্যায়ের অবসান হলো।