১ থেকে ৮ নম্বর ব্লকজুড়ে শত শত মানুষের বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন, ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন; অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি
রিফাত-জুম্মনকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে উত্তাল এরশাদনগর
- আপডেট সময় : ০৯:৩৯:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৫৭৭ বার পড়া হয়েছে

গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী পূর্ব থানাধীন এরশাদনগরে রিফাত দেওয়ান ও তাঁর বন্ধু জুম্মনের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। ঘটনার প্রতিবাদে এরশাদনগরের ১ নম্বর ব্লক থেকে ৮ নম্বর ব্লক পর্যন্ত শত শত মানুষের অংশগ্রহণে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই ঘটনায় এরশাদনগর ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বিএনপি এবং এলাকার সর্বস্তরের মানুষ।
এ ঘটনায় টিভি আনোয়ার ও তাঁর ভাগিনা হিসেবে পরিচিত মঞ্জুসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে হামলার নির্দেশদাতা ও মদদদাতা হিসেবে অভিযোগ তুলেছেন প্রতিবাদকারীরা। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে রিফাত দেওয়ান ও তাঁর বন্ধু জুম্মনের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ।


যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত, মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ অক্টোবর ২০২৬ রাত আনুমানিক ৮টার দিকে এরশাদনগর ৬ নম্বর ব্লকের বালুর মাঠের সামনের পাকা রাস্তায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সময় ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি পদপ্রার্থী রিফাত দেওয়ান (২৪) তাঁর বন্ধু জুম্মন (২৫) এবং আরও কয়েকজনকে নিয়ে মাঠে খেলতে যাচ্ছিলেন।
এজাহারের বাদী ও রিফাতের বড় ভাই মোঃ ফরহাদ হোসেনের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একই এলাকার কয়েকজনের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের বিরোধ চলছিল। এর আগে রিফাতকে দেখে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার দিন পূর্ববিরোধের জেরে অভিযুক্তরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাঁদের পথরোধ করে। একপর্যায়ে কথা-কাটাকাটির পর রিফাত ও তাঁর বন্ধুদের ওপর হামলা চালানো হয়।
এজাহারে বলা হয়েছে, হামলাকারীদের একজনের হাতে থাকা সুইচগিয়ার দিয়ে রিফাতের মাথায় আঘাতের চেষ্টা করা হলে তিনি হাত দিয়ে প্রতিরোধ করেন। এতে তাঁর বাম বাহুতে গুরুতর কাটা জখম হয়। অন্যদিকে, জুম্মনের পেট, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো চাপাতি ও ছোরার আঘাতে গুরুতর রক্তাক্ত জখম হয়। এ সময় রিফাতের সঙ্গে থাকা অন্যদেরও এলোপাতাড়ি মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল, টঙ্গীতে নিয়ে যান। সেখানে রিফাতকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। জুম্মনের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। মামলার এজাহার দায়েরের সময় তিনি সেখানে ভর্তি ছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
১৩ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা, আহত রিফাতের বড় ভাই মোঃ ফরহাদ হোসেন বাদী হয়ে টঙ্গী পূর্ব থানায় লিখিত এজাহার দায়ের করেন। এজাহারে টিভি আনোয়ার, তহিদুল ইসলাম মধু, হাবিব, আইনুল হক, রতন, নয়ন, মহিন, নুরনবী, শাহ জালাল, আল আমিন, সোহাগ, ইমন ও রায়হানসহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। থানার প্রাথমিক তথ্য বিবরণী অনুযায়ী, দণ্ডবিধির ১৪৩/৩৪১/৩২৩/৩২৬/৩০৭/৫০৬/১০৯ ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে টঙ্গী পূর্ব থানার সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) মোঃ মাহফুজুর রহমানকে।
১ থেকে ৮ নম্বর ব্লকজুড়ে বিক্ষোভ, মানববন্ধনে শত শত মানুষ, রিফাত ও জুম্মনের ওপর হামলার প্রতিবাদে এরশাদনগরের ১ নম্বর ব্লক থেকে ৮ নম্বর ব্লক পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল বের করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মিছিলে শত শত মানুষ অংশ নেন। পরে মানববন্ধনের মাধ্যমে তাঁরা হামলার প্রতিবাদ জানান এবং অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি তোলেন। বিক্ষোভে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, মহিলা দলের নেত্রী, স্থানীয় সামাজিক ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। তাঁদের কণ্ঠে ছিল একটাই দাবি এরশাদনগরে সন্ত্রাস, সহিংসতা ও অপরাধের কোনো স্থান হতে পারে না। ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
৪৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন, এরশাদনগর ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মোঃ কামরুল ইসলাম কামু, হামলায় আহত রিফাত দেওয়ান এবং মামলার বাদী মোঃ ফরহাদ হোসেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মোঃ মজিবুর রহমান মাস্টার, রমিজ, আমির হাসান, মনসুর কন্ট্রাক্টর, জলিল, আকাশ, কসাই বাবু, মনির, নুরুজ্জামান, বাবুল, মন্টু, আমির, হাসান, নুর ইসলাম, দুলাল মিয়া, আরিফ, জাকির, নাসির, বাদল, শাহজাহান, দাদন, সজিব, রুস্তম, আনোয়ার, শাহ আলম, মোশারফ, রফিকুল, সবুর, ওসমান, বাচ্চু, জয়নালসহ বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, মহিলা দলের নেত্রী এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
কামরুল ইসলাম কামু: অতীতের নির্যাতনের কথা তুলে ধরে বললেন, নিরপেক্ষ বিচার চাই, সংবাদ সম্মেলনে কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মোঃ কামরুল ইসলাম কামু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অতীত অভিজ্ঞতা ও পরিবারের ওপর ঘটে যাওয়া বিভিন্ন নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০১৬ সালের ১৫ এপ্রিল তৎকালীন সাবেক ধর্মমন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র অধ্যাপক এম এ মান্নাসহ বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের একটি মামলায় তাঁকে ১১ নম্বর আসামি করা হয়েছিল। ওই মামলায় তাঁকে কারাগারেও যেতে হয় বলে তিনি জানান। কামরুল ইসলাম কামুর দাবি, তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। বরং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাঁকে মামলায় জড়ানো হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কারাগারে থাকাকালে তাঁর ছেলে ও মা মারা যান, তাঁর ভাইকে মারধর করে পঙ্গু করে দেওয়া হয় এবং তাঁদের বাড়িঘরে লুটপাট চালানো হয়। এসব ঘটনায় তাঁর পরিবার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, “আমি যদি আওয়ামী লীগ করতাম, তাহলে আমার বিরুদ্ধে মামলা হলো কেন? আমাকে কারাগারে থাকতে হলো কেন? আমার পরিবারকে এত নির্যাতন সহ্য করতে হলো কেন? আমি যদি কোনো অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত থাকি, তাহলে আইন অনুযায়ী আমার বিচার করুন। আর যদি নির্দোষ হই, তাহলে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র বন্ধ হওয়া উচিত।” তিনি আরও বলেন, অতীতে যারা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক ও ওঠাবসার পরিচয় দিয়েছেন, তাঁদের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ের ছবি ও তথ্য সামনে এনে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং তাঁর কর্মকাণ্ড ও সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে বিচার হওয়া উচিত।
কামরুল ইসলাম কামু বলেন, রিফাত ও জুম্মনের ওপর হামলার ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। ন্যায়বিচার না পেলে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে তুলে ধরবেন বলেও তিনি জানান। একই সঙ্গে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার এবং গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম. মঞ্জুরুল করিম রনির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
রিফাত দেওয়ান: আমরা অপরাধী হলে আইনের মাধ্যমে বিচার করুন, সংবাদ সম্মেলনে হামলায় আহত রিফাত দেওয়ান বলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু তাঁরা নির্দোষ হলে হামলার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, “আমরা যদি খারাপ হয়ে থাকি, তাহলে আইনের মাধ্যমে আমাদের বিচার করুন। আর আমরা যদি নির্দোষ হয়ে থাকি, তাহলে যারা আমাদের ওপর হামলা করেছে, তাদের সঠিক বিচার চাই। আমরা কারও সঙ্গে অন্যায় করতে চাই না, আমরাও অন্যায়ের শিকার হতে চাই না।” তিনি প্রশাসনের কাছে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও দাবি জানান।

প্রশাসক ও সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপ কামনা, সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার, গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম. মঞ্জুরুল করিম রনি এবং টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষমতার কারণে যেন কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে না পারে। একই সঙ্গে নিরপরাধ কোনো ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এরশাদনগরবাসীর প্রত্যাশা, রিফাত দেওয়ান ও জুম্মনের ওপর হামলার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হবে, আহতরা ন্যায়বিচার পাবেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মানুষের নিরাপত্তা, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার এরশাদনগরবাসীর দাবি এখন একটাই।












