যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যে, অভাব-সংগ্রামেও রাজনীতির মাঠে মোছাম্মদ বুলবুলি
ফল বিক্রির সামান্য আয়, তবুও দলের কর্মসূচিতে নিজের উপার্জন ব্যয়
- আপডেট সময় : ০৯:৩৬:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৫৭৭ বার পড়া হয়েছে

রাজনীতিতে অনেকেই সময়ের সঙ্গে পরিচিতি, পদ-পদবি কিংবা নানা সুযোগ-সুবিধা অর্জন করেন। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা কোনো পদ-পদবি বা ব্যক্তিগত প্রাপ্তির প্রত্যাশা ছাড়াই জীবনের দীর্ঘ সময় একটি সংগঠনের পাশে কাটিয়ে দেন। তাঁদেরই একজন মোছাম্মদ বুলবুলি। টঙ্গীর এরশাদনগর ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের ৩ নম্বর ব্লকের এই নারী কর্মী যৌবন থেকে আজ বার্ধক্যে পৌঁছেও দলের কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছেন। অথচ তাঁর নিজের জীবনটাই কাটছে অভাব, অসুস্থতা ও নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।
বুলবুলির জীবনসংগ্রাম শুরু হয়েছিল অনেক আগে। সংসারের দায়িত্ব সামলাতে কখনো মাটির ইট ভাঙার কাজ, কখনো শুঁটকি মাছ বিক্রি, কাপড়ের ব্যবসা, শুকনা কাঠ ও খড়ি বিক্রি, আবার কখনো মুদি দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। কঠোর পরিশ্রম করতে করতে তাঁর হাতের তালুতে শক্ত কড়া ও ক্ষতের মতো চিহ্ন তৈরি হয়েছে। এসব চিহ্ন যেন তাঁর জীবনের দীর্ঘ কষ্টের নীরব সাক্ষী।

তিন ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আজও তাঁর ছোট ছেলে বেকার। মায়ের একান্ত প্রত্যাশা, কেউ যদি তাঁর ছেলেটির জন্য একটি সম্মানজনক চাকরির ব্যবস্থা করে দিতেন, তাহলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অন্তত কিছুটা স্বস্তি পেতেন।
ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর কষ্টের শেষ নেই। স্বামী জীবিত থাকলেও প্রায় ২০ বছর ধরে তাঁরা আলাদা থাকছেন বলে জানা যায়। বুলবুলির ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর স্বামীর কিছু কর্মকাণ্ড ও জীবনাচরণ তিনি পছন্দ করতেন না। পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার কারণেও স্বামী তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে থাকেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে নিজের মতো করেই সংসার ও জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

২০১১ সালে তাঁর বাবা মারা যান। তাঁর বাবা পুলিশের গাড়িচালক ছিলেন। বাবাকে হারানোর পর জীবনের কঠিন বাস্তবতা আরও গভীরভাবে অনুভব করতে হয়েছে তাঁকে। একদিকে সংসারের দায়িত্ব, অন্যদিকে নিজের জীবিকা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সবকিছু সামলে আজও পথ চলছেন বুলবুলি। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, নিজের সংসার চালানোর মতো আয় যেখানে সীমিত, সেখানে দলের কর্মসূচিতে অংশ নিতে নিজের উপার্জনের একটি অংশ ব্যয় করেন তিনি। বর্তমানে ছোট পরিসরে ফল ও কাঁচামাল বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে তাঁর জীবন। অনেক সময় বিক্রির ফল পচে নষ্ট হয়ে যায়। সেই সীমিত আয় থেকেও দলের নেতাকর্মীদের জন্য খরচ করেন, মহিলা কর্মীদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আপ্যায়ন ও সহযোগিতার ব্যবস্থা করেন।
মাঝেমধ্যে অসুস্থ শরীর নিয়েও দলের মিছিল, মিটিং ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে উপস্থিত হন তিনি। সম্প্রতি ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি কার্যালয়ে বেগম খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানেও তাঁর উপস্থিতি ছিল। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও সংগঠনের প্রতি ভালোবাসা থেকেই এমন অংশগ্রহণ বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তবে এত দীর্ঘ পথচলায় তাঁর ব্যক্তিগত প্রাপ্তির হিসাব খুবই সামান্য। জীবনের দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও দলের জন্য নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে গেছেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, তাঁর অসুস্থতা, আর্থিক সংকট কিংবা পারিবারিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নেতাকর্মী তাঁর পাশে আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তাঁর জীবনের গল্পে তেমন কোনো প্রাপ্তির কথা উঠে আসেনি।
বুলবুলির প্রতি সম্মান ও সহযোগিতার আহ্বান, মোছাম্মদ বুলবুলির জীবন শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মীর গল্প নয়; এটি একজন সংগ্রামী মায়ের জীবনকাহিনি। যিনি নিজের অভাব ভুলে সংগঠনের কর্মসূচিতে সময় দিয়েছেন, নিজের সামান্য উপার্জন থেকেও অন্যদের জন্য ব্যয় করেছেন। রাজনীতির মাঠে এমন নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের অবদান শুধু প্রশংসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। দলের দায়িত্বশীল নেতা, জনপ্রতিনিধি, বিত্তবান ব্যক্তি ও সমাজের মানবিক মানুষদের প্রতি আহ্বান, মোছাম্মদ বুলবুলির পাশে দাঁড়ান। তাঁর চিকিৎসা ও আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা করুন এবং তাঁর বেকার ছোট ছেলের জন্য একটি সম্মানজনক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে এগিয়ে আসুন।
যে নারী নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও দলের কর্মসূচিতে অবদান রাখার চেষ্টা করেছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি অন্তত সম্মান, সহমর্মিতা ও সহযোগিতা পাওয়ার অধিকার রাখেন। তাঁর মতো ত্যাগী কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়নই হতে পারে একটি সংগঠনের মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও সাংগঠনিক শক্তির প্রকৃত পরিচয়। কারণ রাজনীতি শুধু পদ-পদবির পরিচয় নয়, রাজনীতি মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও নাম।









