জীবন কখনো কখনো এমন কিছু মানুষের গল্প লিখে, যা শুধু একটি সংবাদ নয় একটি দীর্ঘশ্বাস, একটি কান্না, একটি অসমাপ্ত স্বপ্নের গল্প হয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। তেমনি এক সংগ্রামী মানুষের নাম মোঃ আব্দুল (সুজন)। ১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির জীবন ছিল না কোনো সুখের গল্প। ছোটবেলা থেকেই তাঁকে লড়াই করতে হয়েছে অভাব, কষ্ট, দায়িত্ব এবং নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে। তাঁর পিতা মরহুম মোঃ ইউনুছ মিয়া ছিলেন বাংলাদেশ ডাক বিভাগের প্রধান কার্যালয় ঢাকা জিপিওর একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মচারী। দীর্ঘ চাকরি জীবনের পর ১৯৯০ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। সন্তানদের মানুষ করা এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়াই ছিল তাঁর স্বপ্ন। কিন্তু নিয়তির নির্মম খেলায় সেই স্বপ্ন পূর্ণতা পায়নি।
১৯৯৫ সালে মারা যান আব্দুল সুজনের মা মরহুমা মনোয়ারা বেগম। মায়ের স্নেহ হারানোর সেই ক্ষত শুকানোর আগেই ২০০০ সালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন পিতা ইউনুছ মিয়া। মা-বাবার মৃত্যুর পর সাত ভাই-বোনের সংসারে নেমে আসে অনিশ্চয়তার অন্ধকার। তিন ভাই ও চার বোনের এই পরিবারে মোঃ আব্দুল (সুজন) ছিলেন সেজো সন্তান। পরিবারের দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে খুব অল্প বয়স থেকেই তাঁকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। মা-বাবার মৃত্যুর পর নিজের স্বপ্ন, নিজের চাওয়া-পাওয়া এবং নিজের ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়ে তিনি ভাই-বোনদের মানুষ করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
সাত ভাই-বোনের মধ্যে সেজো সন্তান হয়েও তিনি বড় ভাইয়ের মতো দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজের স্বপ্নকে পিছনে রেখে ভাই-বোনদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য জীবনভর সংগ্রাম করে গেছেন। বছরের পর বছর কেটে গেছে। ভাই-বোনেরা আজ নিজেদের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু আব্দুল সুজনের জীবন থেকে সংগ্রাম কখনো বিদায় নেয়নি। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনিও যোগ দেন ঢাকা জিপিওতে। সরকারি চাকরির মাধ্যমে জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্য যেন বারবার তাঁর পথ রুদ্ধ করেছে।
অসুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধ। ২০১৩ সাল থেকে একের পর এক জটিল রোগ তাঁকে গ্রাস করতে শুরু করে। কিডনি সমস্যা, মেরুদণ্ডের জটিলতা, কোমরের অসহনীয় ব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় তিনি ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা হারাতে থাকেন। অবশেষে ২০১৬ সালে শারীরিক অক্ষমতার কারণে তাঁকে চাকরি থেকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়। চাকরি জীবনের সঞ্চয়, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং অবসরকালীন প্রাপ্য অর্থের প্রায় সবটাই ব্যয় হয়ে যায় চিকিৎসা ও সংসারের পেছনে। বর্তমানে যে সামান্য পেনশন পান, তার বড় অংশ চলে যায় ওষুধ কিনতেই। একসময় যিনি পরিবারের ভরসা ছিলেন, অন্যের পাশে দাঁড়াতেন, আজ তিনিই জীবনযুদ্ধের এক কঠিন মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
কিন্তু হারিয়ে যায়নি স্বপ্ন। তবে এখানেই শেষ নয় তাঁর গল্প। কারণ তাঁর বুকের ভেতর এখনো একটি স্বপ্ন বেঁচে আছে। একটি সুর বেঁচে আছে। একটি গান বেঁচে আছে। গানই তাঁর জীবন। গানই তাঁর ভালোবাসা। গানই তাঁর বেঁচে থাকার প্রেরণা। শারীরিক কষ্ট, আর্থিক সংকট এবং নিঃসঙ্গতার মাঝেও তিনি সংগীতকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন। একসময় তিনি নিজ উদ্যোগে একটি নৃত্য ও সাংস্কৃতিক একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেখানে অসংখ্য ছেলে-মেয়েকে গান ও নাচ শিখিয়েছেন। নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতির আলোয় আলোকিত করার জন্য কাজ করেছেন। কিন্তু অসুস্থতা তাঁর সেই পথও থামিয়ে দেয়। তবুও থামেনি তাঁর স্বপ্ন। আজও তিনি গান গাইতে চান। আজও তিনি সুর নিয়ে ভাবেন। আজও তিনি বিশ্বাস করেন, একদিন তাঁর কণ্ঠ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যাবে।
তাঁর গাওয়া জনপ্রিয় গানসমূহ:- নিজ কণ্ঠে পরিবেশিত উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে রয়েছে,
🎵 বন্ধুর বাড়ি ফুলবাগানে, নানান রঙের ফুল
🎵 হৃদয়টারে গান গাওয়া উজাড় করে
🎵 তোমায় লইগা হমু দেশান্তর
🎵 প্রাণ সখিরে তোমায় লইয়া হমু দেশান্তর
🎵 ও বন্ধুরে রাখ তোমায় বুকে ধরিয়া, আমি হারাই যদি বন্ধু
🎵 বন্ধু ছাড়া প্রেম হয় না
🎵 বন্ধু ছাড়া সুখ হয় না
🎵 মাতা ছাড়লাম, পিতা গো ছাড়লাম, ও সাথী ছাড়লাম রাতের আশা
🎵 আকাশ কাঁদে, বাতাস কাঁদে
🎵 সোনা দিয়া হাত কেটে বাধাইলি বকুল ফুল
🎵 রূপের মাইয়া একবার চাইয়া গো, ভাব লাগাইয়া পরান কারিলে
এছাড়াও তিনি আরও বহু গান পরিবেশন করেছেন, যা এখনো বৃহত্তর শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। একটি ইউটিউব চ্যানেলের স্বপ্ন। তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—✔ নিজের গাওয়া গানগুলো রেকর্ড করা। ✔ একটি ইউটিউব চ্যানেল চালু করা। ✔ নিজের কণ্ঠে গান মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। ✔ একটি ছোট্ট সংগীত অ্যালবাম প্রকাশ করা। ✔ নিজের প্রতিভার মাধ্যমে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকা। কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম। একটি সাধারণ রেকর্ডিং সেটআপ, একটি ভালো মাইক্রোফোন, কিছু স্টুডিও খরচ এবং একটি ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনার সামর্থ্যও আজ তাঁর নাগালের বাইরে।
তিনি করুণা নয়, একটি সুযোগ চান, মোঃ আব্দুল (সুজন) কারও কাছে ভিক্ষা চান না। তিনি করুণা চান না। তিনি দয়ার দানও চান না। তিনি শুধু চান, একটি সুযোগ। একটি সহযোগিতার হাত। একটি মাইক্রোফোন। একটি ছোট রেকর্ডিং ব্যবস্থা। নিজের স্বপ্ন পূরণের সামান্য সহায়তা।
সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিল্পী, মানবিক সংগঠন, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং সকল হৃদয়বান মানুষের প্রতি বিনীত আবেদন, আপনার সামান্য সহযোগিতা হয়তো একজন অসুস্থ কিন্তু প্রতিভাবান মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। হয়তো আপনার দেওয়া একটি মাইক্রোফোন, একটি রেকর্ডিং সহযোগিতা, একটি ইউটিউব সেটআপ কিংবা সামান্য আর্থিক সহায়তাই তাঁর বহু বছরের স্বপ্ন পূরণের পথ খুলে দিতে পারে। হয়তো আপনার একটি শেয়ার, একটি পরিচয়, একটি ফোন কল কিংবা একটি মানবিক উদ্যোগ তাঁকে আবার নতুন করে বাঁচার সাহস দেবে। কারণ একজন মানুষ যখন জীবনের সবকিছু হারিয়েও স্বপ্ন দেখতে জানেন, তখন সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা শুধু তাঁর দায়িত্ব নয় আমাদেরও দায়িত্ব। আসুন আমরা বলি, "মোঃ আব্দুল (সুজন), আপনি একা নন। আমরা আপনার পাশে আছি।" হয়তো মানবতার এই ছোট্ট হাতই ফিরিয়ে দিতে পারে একজন সংগ্রামী শিল্পীর হারিয়ে যাওয়া হাসি, নতুন করে বাঁচার সাহস এবং তাঁর বহুদিনের লালিত স্বপ্ন।
মানুষ মানুষের জন্য।
মানবতার জয় হোক।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ ইউনুস আলি মোবাইলঃ ০১৯৭১৮৫৬৮৫৫ ইমেইলঃ sangbadalochona@gmail.com
Developed By : Sabbirelectronics.com