ছবি: সংগ্রহীত
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রাজধানীর মিরপুর ও গাজীপুরে বিক্ষোভে নেমেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। রোববার (১ নভেম্বর) সকাল থেকে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন শুরু করেন তাঁরা। মিরপুরে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। গাজীপুরের কোনাবাড়িতে পুলিশ বক্সেও আগুন দিয়েছেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের বোর্ড ঘোষণা করেছে সরকার।
রোববার সকাল ৯টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে সড়ক অবরোধের মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের বিক্ষোভ শুরু হয়। মিরপুর-১, ১১, ১২, পল্লবী, মিরপুর-১৩ ও কাজীপাড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা এতে যোগ দেন। পরে প্রশিকা মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায়ও শ্রমিকদের অবস্থানের কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যানবাহন আটকে পড়ায় আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটলেও বেলা ২টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
বেলা ১১টার কিছু আগে পুলিশ শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। তবে আন্দোলনকারীরা সাড় না দিলে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও লাঠিসোঁটা নিক্ষেপ করেন। পরে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে মিরপুর-২, ১১, ১৩ ও শেওড়াপাড়ার দিকে ছড়িয়ে পড়েন।
দুপুরের দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর পুলিশের নিয়ন্ত্রণে এলেও বেলা ২টা প্রযন্ত আশপাশের সব সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। বিশেষ করে মিরপুর-১০ থেকে ১১ ও ১২ নম্বরমুখী সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। ট্রাফিক পুলিশ বিকল্প পথে গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করে।
সংঘর্ষের মধ্যে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে গাড়িটি পুড়ে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে তাঁদেরও ধাওয়া দেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা। পল্লবী ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে একটি দল ঘটনাস্থলে যায়।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন জানান, সকাল থেকেই মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছিলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যান চলাচল স্বাভাবিক করতে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছিল।
পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার আবু নাসের রিকাবদার দুপুর ১২টার দিকে জানান, তখনও সংঘর্ষ চলছিল এবং আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। অন্যদিকে মিরপুর জোন ট্রাফিক বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহফুজুল হক বকশী সকালে জানান, মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর দিয়ে যান চলাচল বন্ধ থাকায় বিকল্প পথে গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করা হচ্ছিল।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ক্রাইম প্রিভেনশন উত্তরের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. মহিদুল ইসলাম বলেন, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কিছু দুষ্কৃতকারী যুক্ত হয়ে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছিল। জনসাধারণের দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে লাঠিচার্জ না করে সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়নি এবং পুলিশের কোনো সদস্য আহত হননি।
তবে সংঘর্ষের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় রোববারের সংঘর্ষে কোনো শ্রমিক বা পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এদিকে পুলিশের বিরুদ্ধে সাংবাদিকের ফোন নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে মো. মহিদুল ইসলাম জানান, পুলিশ ও সাংবাদিকেরা বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করায় তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগটি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এমন ঘটনা ঘটে থাকলে ফোন উদ্ধার এবং অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোনাবাড়িতে পুলিশ বক্সে আগুন, মিরপুরের পাশাপাশি গাজীপুরেও শ্রমিক বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। রোববার সকাল ১০টার দিকে গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ি এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। একপর্যায়ে উত্তেজিত শ্রমিকেরা কোনাবাড়ি পুলিশ ট্রাফিক বক্সে আগুন দেন।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) এস এম আশরাফুল আলম জানান, প্রথমে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা পুলিশ বক্সের কাচ ভাঙচুর করেন। পরে সেখানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালনের সময় বিশ্রামের জন্য বক্সটি ব্যবহার করতেন। সেখানে মূল্যবান কোনো জিনিসপত্র ছিল না। তবে বক্সের আসবাব আগুনে পুড়ে গেছে।
শ্রমিক বিক্ষোভে গাজীপুরের কোনাবাড়ি, শফিপুর, মৌচাক ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এসব এলাকায় সকাল থেকে দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়। তবে সংঘর্ষে হতাহতের কোনো তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড ঘোষণা, শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড ঘোষণা করেছে সরকার। রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বোর্ডের সদস্যদের নাম জানান শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এদিনই এ বিষয়ে দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিন এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব।
শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের (বিজিআইডব্লিউএফ) সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন। নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর সংশোধিত বিধান অনুযায়ী বোর্ডের সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মূল মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও চার সদস্যের সঙ্গে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিক ও শ্রমিকপক্ষের একজন করে প্রতিনিধি যুক্ত করে ছয় সদস্যের এই বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
শ্রমমন্ত্রী জানান, শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রায় চার ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম ভবনে বিজিএমইএ ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি।
মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন মজুরি বোর্ড গঠন শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল। সরকার, পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন এবং শ্রমিক প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে একমত হয়েছেন। শ্রমিক প্রতিনিধিরাও তাঁদের মনোনীত সদস্যদের নাম জমা দিয়েছেন।
কেন আন্দোলনে শ্রমিকেরা, ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরে আন্দোলন করছেন পোশাকশ্রমিকেরা। এর পাশাপাশি শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ এবং ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পুনর্নিয়োগের দাবিও রয়েছে। মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত হলেও শ্রমিকেরা তাঁদের মূল দাবিতে অনড় রয়েছেন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল থেকেই মিরপুর, সাভার ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ওই দিনের সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ১৫ জন আহত হন। মিরপুরের শাহ আলী থানাধীন হিমালয় গার্মেন্টসের নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়। পরে হিমালয় গার্মেন্টস ও পাশের বাগদাদ শপিং কমপ্লেক্সে ভাঙচুর চালানো হয়। বিকেল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে পল্লবীর ২২ তলা পোশাক কারখানাতেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন আন্দোলনকারীরা।
এর আগেও বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় একই দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকেরা। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কয়েক শ শ্রমিক মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে অবস্থান নেন। পরে তাঁরা সেখান থেকে সরে গিয়ে পূরবী সিনেমা হলের সামনে মেট্রোরেলের ১১ নম্বর স্টেশন এলাকায় আবার সড়ক অবরোধ করেন। দুই দফায় প্রায় ছয় ঘণ্টা অবরোধের পর বিকেলে শ্রমিকেরা সড়ক ছেড়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
তৈরি পোশাকশ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৩ সালের নভেম্বরে। ওই মজুরি কার্যকর হয় একই বছরের ডিসেম্বরে। তখন শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এতে মজুরি বেড়েছিল ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।
বর্তমান মজুরির তিন বছরের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। চলতি বছর শ্রম আইন সংশোধন করে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। নতুন বোর্ডের দায়িত্ব হবে সংশ্লিষ্ট মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের পরবর্তী ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া।
সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করলেও ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম বেতনের দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। মিরপুর ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ ইউনুস আলি মোবাইলঃ ০১৯৭১৮৫৬৮৫৫ ইমেইলঃ sangbadalochona@gmail.com
Developed By : Sabbirelectronics.com