টঙ্গীর রাজপথ অনেক আন্দোলন দেখেছে। অনেক মিছিল দেখেছে। অনেক স্লোগান শুনেছে। কিন্তু কিছু কিছু দৃশ্য থাকে, যা কেবল চোখে দেখা যায় না অনুভব করতে হয় হৃদয় দিয়ে। গতকালের টঙ্গী ঠিক তেমনই এক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকলো। সেখানে ছিল না কোনো ক্ষমতার প্রদর্শনী। ছিল না কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থের হিসাব। ছিল না নিজেকে বড় করে দেখানোর প্রতিযোগিতা। সেখানে ছিল কেবল একজন মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। ছিল একজন নেতার আত্মত্যাগ। ছিল রাজনীতিকে হৃদয়ে ধারণ করা এক সৈনিকের নীরব কান্না। সেই মানুষটির নাম টঙ্গী পশ্চিম থানা যুবদলের সভাপতি শেখ মো: সুমন।
যার পা ভাঙা। যিনি প্রতিটি মুহূর্তে ব্যথায় কাতর। যার চলাফেরাই ছিল প্রায় অসম্ভব। যাকে চিকিৎসকরা কঠোরভাবে বিশ্রামে থাকতে বলেছিলেন। যার পরিবার ভয় আর উদ্বেগ নিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত পার করছিল। তবুও তিনি ঘরে থাকেননি।
কারণ কিছু মানুষ আছে যারা শরীর দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে রাজনীতি করে। যারা পদ-পদবীর জন্য রাজপথে নামে না। যারা ভালোবাসার জন্য রাজপথে দাঁড়ায়।
বিশ্বাসের জন্য দাঁড়ায়। আদর্শের জন্য দাঁড়ায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টঙ্গী হয়ে ময়মনসিংহের ত্রিশালের পথে যাত্রা করার সময় হাজারো নেতা-কর্মীর ভিড়ে দেখা গেল এক অন্যরকম দৃশ্য।
একজন যুবক খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে আসছেন। পায়ে মোটা সাদা ব্যান্ডেজ। মুখে ব্যথার ছাপ। তবুও চোখে আগুনের মতো দৃঢ়তা। চারপাশের মানুষ তাকে থামাতে চাইছে। কেউ বলছে “ভাই, বসেন।” কেউ বলছে “এভাবে দাঁড়াবেন না।” কিন্তু তিনি থামেননি। কারণ তার কাছে দল মানে শুধুই রাজনীতি নয়।
দল মানে আত্মার সম্পর্ক। নেতা মানে বিশ্বাসের শেষ আশ্রয়। আর রাজপথ মানে ভালোবাসার পবিত্র মঞ্চ। শেখ মো: সুমন সেদিন শুধু দাঁড়াননি, তিনি যেন নিজের শরীরের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। নিজের ব্যথার সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। নিজের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। কিন্তু কেন?
কারণ একজন নেতার প্রতি ভালোবাসা কখনো কখনো মানুষকে নিজের কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। কিছু সম্পর্ক থাকে, যা রক্তের নয় বিশ্বাসের। কিছু আনুগত্য থাকে, যা ভাষায় বোঝানো যায় না। শুধু হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে তিনি নেতা-কর্মীদের সাহস দিয়েছেন। ক্লান্ত শরীর নিয়েও সবাইকে একত্র রেখেছেন। আর বারবার বলেছেন, “আমার নেতা ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত কেউ এখান থেকে যাবে না।”
এই একটি বাক্যই যেন মুহূর্তে বদলে দেয় পুরো পরিবেশ।
নেতা-কর্মীদের চোখ ভিজে ওঠে।
অনেকেই আবেগ লুকাতে পারেননি।
কারণ তারা বুঝতে পেরেছিলেন—
এটি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়।
এটি একজন ত্যাগী নেতার হৃদয়ের আর্তনাদ।
আজকের রাজনীতিতে যেখানে অনেকেই সুবিধা খোঁজেন,
সেখানে শেখ মো: সুমন দেখিয়ে দিলেন—
ভালোবাসা এখনো বেঁচে আছে।
ত্যাগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
আদর্শ এখনো মানুষের ভেতরে আগুন জ্বালাতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর টঙ্গী অতিক্রম করার পর ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তার শরীর আর সাড়া দিচ্ছিল না। ব্যথায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন পুরোপুরি। পরে সহকর্মীরা তাকে ধরে বাসায় নিয়ে যান। পরবর্তীতে চিকিৎসার জন্য মেডিকেলেও নেওয়া হয়। কিন্তু সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত আসে এরপর। অসুস্থ অবস্থায় নিজের ফেসবুক আইডিতে শেখ মো: সুমন একটি ছোট্ট স্ট্যাটাস দেন—“অবশেষে আর পারলাম না,,, সকলের কাছে চাই দোয়া,,, ”
মাত্র কয়েকটি শব্দ। কিন্তু সেই শব্দগুলোর ভেতরে যেন লুকিয়ে আছে এক সমুদ্র কষ্ট। একজন নেতার দায়িত্ববোধ। একজন কর্মীর আত্মত্যাগ। একজন সৈনিকের নীরব কান্না। এই স্ট্যাটাস পড়ে অসংখ্য নেতা-কর্মী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। অনেকে কান্না ধরে রাখতে পারেননি। কারণ তারা জানেন, এই মানুষটি অভিনয় করেন না। তিনি হৃদয় থেকে ভালোবাসেন। হৃদয় থেকে দায়িত্ব পালন করেন।
আজ টঙ্গীর রাজপথ শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি দেখেনি। আজ টঙ্গী দেখেছে, একজন নেতা কিভাবে নিজের শরীরের চেয়েও বড় করে দলকে ভালোবাসতে পারেন। কিভাবে একজন মানুষ শেষ শক্তিটুকু দিয়েও নেতার প্রতি আনুগত্য ধরে রাখেন। কিভাবে একজন কর্মীবান্ধব নেতা হাজারো মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। আজকের এই দৃশ্য হয়তো কাল ইতিহাসের বইয়ে লেখা হবে না। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে লেখা থাকবে। কারণ কিছু ত্যাগ কাগজে লেখা যায় না, সেগুলো লেখা থাকে মানুষের ভালোবাসায়। নতুন প্রজন্মের অনেক তরুণ আজ শিখেছে রাজনীতি মানে শুধু ব্যানার নয়।
শুধু মিছিল নয়। শুধু ছবি তোলা নয়। রাজনীতি মানে দায়িত্ব। রাজনীতি মানে ভালোবাসা। রাজনীতি মানে নিজের কষ্ট ভুলে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। রাজনীতি মানে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত বিশ্বাসকে আঁকড়ে রাখা। শেখ মো: সুমন আজ প্রমাণ করে দিলেন, ত্যাগী মানুষ কখনো হারিয়ে যায় না। মানুষের হৃদয়ে তারা বেঁচে থাকে বছরের পর বছর। সময়ের পর সময়।
হয়তো একদিন এই ভাঙা পায়ের ব্যথা সেরে যাবে। কিন্তু টঙ্গীর মানুষ কোনোদিন ভুলবে না। সেদিন এক যুবদল নেতা ভাঙা পা নিয়েও রাজপথে দাঁড়িয়ে ছিলেন শুধুই ভালোবাসার জন্য। মহান আল্লাহর কাছে দোয়া, তিনি যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে আবারও মানুষের মাঝে ফিরে আসতে পারেন। আবারও কর্মীদের সাহস দিতে পারেন। আবারও রাজপথে দাঁড়িয়ে ভালোবাসা, ত্যাগ আর দায়িত্ববোধের নতুন ইতিহাস লিখতে পারেন।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ ইউনুস আলি মোবাইলঃ ০১৯৭১৮৫৬৮৫৫ ইমেইলঃ sangbadalochona@gmail.com
Developed By : Sabbirelectronics.com