একটি মসজিদ কেবল নামাজ আদায়ের স্থান নয়, একটি মাদ্রাসা কেবল পাঠদানের প্রতিষ্ঠান নয়, সঠিক পরিচর্যা ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় এগুলো হয়ে উঠতে পারে একটি আলোকিত সমাজ নির্মাণের ভিত্তি। পবিত্র কুরআনের শিক্ষা, নৈতিকতার চর্চা এবং আদর্শ প্রজন্ম গড়ার সেই প্রত্যয়কে সামনে রেখে গাজীপুরের টঙ্গী এরশাদনগরে অনুষ্ঠিত হয়েছে জামিয়া তা'লিমুল কুরআনের উদ্যোগে ২০তম বার্ষিক ওয়াজ ও দোয়া মাহফিল।
বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬, বাদ আসর থেকে অনুষ্ঠিত হয়ে ১২টা পর্যন্ত এ মাহফিলে টঙ্গী ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো ধর্মপ্রাণ মুসল্লি, আলেম-ওলামা, শিক্ষার্থী ও সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেন। বৃষ্টির কারণে নির্ধারিত স্থান মজিদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের পরিবর্তে এরশাদনগর ২ নম্বর ছোট বাজারের ৫ নম্বর ব্লকে অবস্থিত মসজিদুল আকসা প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় মাহফিল। প্রতিকূল আবহাওয়াও মানুষের ধর্মীয় আগ্রহ ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। কুরআন-হাদিসের আলোচনা, ইসলামী নসিহত ও দোয়া-মোনাজাতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন। এই মাহফিল শুধু একটি বার্ষিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে দ্বীনি শিক্ষা বিস্তার, পবিত্র কুরআনের আলো ছড়িয়ে দেওয়া এবং আগামী প্রজন্মকে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার সম্মিলিত প্রত্যয়েরও প্রতিফলন।

মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি। ওয়ায়েজীনে কেরাম হিসেবে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক আলোচনা পেশ করেন মাওলানা আব্দুল বাসেত খান, শাইখুল হাদীস ও মুহতামিম, জামিয়া নিজামিয়া দারুল উলুম বেতুয়া, সিরাজগঞ্জ; মাওলানা নজীর আহমদ, শাইখুল হাদীস, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, টঙ্গী; মাওলানা হাসান জামিল, শাইখুল হাদীস ও মুহতামিম, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ; এবং মুফতী আমীনুল ইসলাম মাহবূবী, মুহাদ্দিস, জামিয়া নেছারিয়া ইসলামিয়া, টঙ্গী। মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন আলহাজ্জ মোঃ অলি উল্লাহ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, উত্তরা, ঢাকা এবং মসজিদুল আকসা ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের উপদেষ্টা। দোয়া পরিচালনা করেন শাইখুল হাদীশ মুফতী মাসউদুল করীম, মুহতামিম, টঙ্গী দারুল উলুম মাদ্রাসা ও অত্র জামিয়ার প্রধান উপদেষ্টা। মাহফিল পরিচালনায় ছিলেন হাফেজ মাওলানা জিয়াউল হক, ইমাম, মসজিদুল আকসা।
হিফজের সবক থেকে বৃহত্তর দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন, মাহফিলের আলোচনায় দ্বীনি শিক্ষার গুরুত্ব, পবিত্র কুরআনের আদর্শে জীবন গঠন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সৎ, যোগ্য ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, শিক্ষা তখনই প্রকৃত সার্থকতা লাভ করে, যখন তা মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধির পাশাপাশি চরিত্রকে সুন্দর করে, বিবেককে জাগ্রত করে এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করে। তাঁরা জামিয়া তা'লিমুল কুরআনের শিক্ষা কার্যক্রমের প্রশংসা করেন এবং প্রতিষ্ঠানটির উত্তরোত্তর উন্নতি ও সাফল্য কামনা করেন। তাঁদের আশাবাদ, আজকের এই দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হবে; এখানে হিফজ ও কিতাব বিভাগের পাশাপাশি উচ্চতর ইসলামী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হবে। ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও বৃহত্তর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার যে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে প্রয়োজন ধারাবাহিক উদ্যোগ, যোগ্য শিক্ষকমণ্ডলী, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি থেকে হাফেজ শিক্ষার্থী তৈরি হচ্ছে, এটি দ্বীনি শিক্ষার অগ্রযাত্রায় একটি আশাব্যঞ্জক দিক। একটি শিশু যখন পবিত্র কুরআন মুখস্থ করে, তখন তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবার, শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ সাধনা। সেই সাধনাকে এগিয়ে নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত লক্ষ্য।
মোঃ আব্দুল হাকিম: দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে নীরব সহযোগিতার এক নাম, এলাকায় মসজিদ, মাদ্রাসা ও মক্তবভিত্তিক দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে মোঃ আব্দুল হাকিমের উদ্যোগ ও সহযোগিতার বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নিজ পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন মাদ্রাসা ও মক্তবের জন্য সময় দেন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করে থাকেন। মসজিদুল আকসাকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসা ও হিফজখানা গড়ে তোলার উদ্যোগের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা নীরবে ভালো কাজ করে যান; তাঁদের প্রচার-প্রচারণার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তাঁদের উদ্যোগের ইতিবাচক প্রভাব। দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে সময় দেওয়া, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব। মোঃ আব্দুল হাকিমের মতো সহযোগীদের আন্তরিকতা এবং স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে মসজিদুল আকসা ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের শিক্ষা কার্যক্রম আরও বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। একটি এলাকার প্রকৃত অগ্রগতি কেবল রাস্তাঘাট বা অবকাঠামোগত উন্নয়নে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষিত, নৈতিক ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলাও সেই অগ্রগতির অপরিহার্য অংশ।
নূরানী, নাজেরা, হিফজ ও কিতাব বিভাগে ভর্তি চলছে, জামিয়া তা'লিমুল কুরআনে বর্তমানে নূরানী, নাজেরা, হিফজ ও কিতাব বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তি চলছে। শিশু-কিশোরদের পবিত্র কুরআন শিক্ষা, শুদ্ধ তিলাওয়াত, মুখস্থকরণ এবং দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির এ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অভিভাবকদের জন্য সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শৈশবে অর্জিত সঠিক শিক্ষা, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার চর্চা ভবিষ্যৎ জীবনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যায় নয়; শিক্ষার মান, শিক্ষকদের আন্তরিকতা, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ এবং তাদের সুন্দর চরিত্র গঠনের মধ্য দিয়েই তার প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, জামিয়া তা'লীমুল কুরআন ভবিষ্যতেও শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং যোগ্য হাফেজ ও আলেম তৈরির লক্ষ্যে নিষ্ঠার সঙ্গে এগিয়ে যাবে।
সম্মিলিত উদ্যোগে এগিয়ে যাক মসজিদুল আকসা ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, মাহফিলের শুভেচ্ছান্তে ছিলেন মোঃ শফিকুল ইসলাম মাস্টার, সভাপতি, মসজিদুল আকসা ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স। সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন মসজিদুল আকসা ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স পরিচালনা পরিষদ, স্থানীয় এলাকাবাসী এবং ২ নম্বর ছোট বাজারের ব্যবসায়ীবৃন্দ। সৌজন্যে ছিলেন মোঃ কামরুল ইসলাম কামু, কাউন্সিলর পদপ্রার্থী, এরশাদনগর ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড। অনুষ্ঠানে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। মাহফিলের আয়োজন সফল করতে আয়োজক, আলেম-ওলামা, স্বেচ্ছাসেবক, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর সম্মিলিত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বৃষ্টির কারণে স্থান পরিবর্তনের পরও আয়োজন অব্যাহত রাখা ছিল তাঁদের সমন্বিত উদ্যোগের একটি দৃষ্টান্ত।
দোয়া ও কল্যাণের প্রত্যাশায় সমাপ্তি, মাহফিলের শেষ পর্বে দেশ ও জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, মানুষের পারস্পরিক সম্প্রীতি এবং সব দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নতি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পরিচালনা পরিষদ, সহযোগী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্য কল্যাণ কামনা করা হয়। একটি মাহফিলের আয়োজন শেষ হয়, কিন্তু তার শিক্ষা ও প্রেরণা থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে। পবিত্র কুরআনের বাণীকে জীবনের আদর্শ হিসেবে ধারণ করা, সন্তানদের নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তোলা এবং সমাজের কল্যাণে সম্মিলিতভাবে কাজ করার মধ্য দিয়েই এ ধরনের আয়োজনের প্রকৃত তাৎপর্য বাস্তব রূপ পেতে পারে। জামিয়া তা'লীমুল কুরআনের ২০তম বার্ষিক ওয়াজ ও দোয়া মাহফিল সেই প্রত্যাশাকেই নতুন করে সামনে এনেছে, আজকের হিফজখানার শিক্ষার্থী যেন আগামী দিনের আদর্শ মানুষ হয়ে ওঠে, আজকের ছোট্ট দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন ভবিষ্যতে জ্ঞান ও নৈতিকতার বৃহত্তর কেন্দ্রে পরিণত হয়। আর সেই অগ্রযাত্রায় আলেম-ওলামা, অভিভাবক, সমাজের বিত্তবান ও সাধারণ মানুষ, সবার সম্মিলিত সহযোগিতা হয়ে উঠুক সবচেয়ে বড় শক্তি।
পবিত্র কুরআনের আলো ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি ঘরে, দ্বীনি শিক্ষার সৌরভ ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি প্রজন্মে, এই হোক জামিয়া তা'লীমুল কুরআনের আগামীর পথচলার প্রত্যাশা।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ ইউনুস আলি মোবাইলঃ ০১৯৭১৮৫৬৮৫৫ ইমেইলঃ sangbadalochona@gmail.com
Developed By : Sabbirelectronics.com