মানুষের জীবন কি শুধু জন্ম, বেড়ে ওঠা, কর্মজীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে কয়েকটি বছরের নাম? না। কিছু মানুষের জীবন তার চেয়ে অনেক বড়। কিছু জীবন একটি পরিবারের ইতিহাস হয়ে ওঠে। কিছু জীবন একটি গ্রামের স্মৃতি বহন করে। কিছু জীবন রাজনীতির উত্থান-পতনের সঙ্গে মিশে যায়। আর কিছু জীবন এমন এক সময়ের দলিল হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে একই সঙ্গে থাকে ভালোবাসা ও সমালোচনা, সাফল্য ও ব্যর্থতা, অভিযোগ ও আত্মপক্ষ সমর্থন, অন্ধকার ও আলো।
গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী পশ্চিম থানার দাঁড়াইল পশ্চিমপাড়ার আলহাজ্ব মোঃ মনোয়ার হোসেন খোকনের জীবনকথা তেমনই একটি বহুমাত্রিক অধ্যায়। তাঁকে কেউ দেখেন সমাজের মানুষের পাশে থাকা একজন ব্যক্তি হিসেবে। কেউ দেখেন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে। কেউ তাঁর জীবনের সংগ্রামকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। আবার তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন ও আলোচনা। এই দুই বাস্তবতাকে পাশাপাশি রেখেই একজন মানুষকে বোঝা সম্ভব। কারণ একজন মানুষের জীবন কখনো শুধু তার নিজের বলা গল্প নয়; সেখানে থাকে পরিবার, প্রতিবেশী, সহকর্মী, সমর্থক, সমালোচক, নথি, আইন এবং সময়ের সাক্ষ্য। আর সেই কারণেই মনোয়ার হোসেন খোকনের জীবনকে একটিমাত্র ঘটনায় বিচার করা যায় না।
এটি একটি দীর্ঘ পথের গল্প। দাঁড়াইলের মাটি ও একটি পরিবারের উত্তরাধিকার, টঙ্গী পশ্চিম থানার দাঁড়াইল পশ্চিমপাড়া। একটি সাধারণ জনপদ। অথচ এই সাধারণ মাটিই তাঁর জীবনের প্রথম পাঠশালা। পিতা মরহুম কুদরত আলী মাতাব্বর এবং মাতা আলহাজ্ব রোকেয়া বেগমের পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের একাংশের ভাষ্যমতে, তাঁর পিতা সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতেন এবং ন্যায়সংগত সমাধানের চেষ্টা করতেন। মাতাও ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও সহমর্মী। সন্তানের চরিত্র গঠনে পরিবার যে ভূমিকা রাখে, মনোয়ার হোসেন খোকনের জীবনেও সেই পারিবারিক মূল্যবোধের প্রভাব ছিল বলে স্বজনেরা মনে করেন। শৈশবের সেই দিনগুলোতে হয়তো কেউ জানত না, এই পরিবারের একটি ছেলে একদিন স্থানীয় রাজনীতি, সমাজ ও সংবাদমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসবেন। কিন্তু ইতিহাসের অনেক গল্পই এভাবেই শুরু হয়। নীরবে। অগোচরে।
অষ্টম শ্রেণিতে থেমেছিল স্কুল, থামেনি জীবন, জীবনের সব স্বপ্ন স্কুলের বেঞ্চে পূর্ণ হয় না। মনোয়ার হোসেন খোকনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন অষ্টম শ্রেণির পর থেমে যায়। কিন্তু তাঁর জীবনের শিক্ষা তখনই যেন অন্য রূপ নেয়। বইয়ের পাতা বন্ধ হয়, খুলে যায় বাস্তবতার পাতা। পরিবারের দায়িত্ব, জীবিকার চিন্তা, ব্যবসা এবং সামাজিক বাস্তবতা তাঁকে অল্প বয়সেই পরিণত করে। নিজের শিক্ষাজীবন অসম্পূর্ণ থাকার আক্ষেপ তাঁর মধ্যে ছিল বলে ঘনিষ্ঠজনেরা জানান। আর সেই আক্ষেপ থেকেই দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল বলে তাঁর পরিবার ও সমর্থকদের দাবি। তাঁর নামে প্রচলিত একটি বক্তব্য, “আমি হয়তো পড়াশোনা শেষ করতে পারিনি, কিন্তু চাই আমার এলাকার প্রতিটি ছেলে-মেয়ে যেন নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।” একজন মানুষের নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন যখন অন্যের স্বপ্ন পূরণের আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়, তখন সেই গল্প আর কেবল ব্যক্তিগত থাকে না।
পরিবার—আলো থেকে অন্ধকার, আবার আলোর পথে। মনোয়ার হোসেন খোকনের ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায় তাঁর পরিবার। স্ত্রী আশা আক্তার পান্না। একমাত্র ছেলে আশরাফুল ইসলাম অন্তর। একটি ছোট পরিবারের বড় স্বপ্ন। ছেলের পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ, সামাজিক প্রতিষ্ঠা, সবকিছু ঘিরে ছিল পরিবারের প্রত্যাশা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া অন্তরকে স্থানীয়দের অনেকে শান্ত ও ভদ্র তরুণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বাবার সঙ্গে তাঁর নামও একটি মামলায় উঠে আসে। এরপর যে ঘটনাটি ঘটে, তা একটি পরিবারের জীবনে দীর্ঘ ছায়া ফেলে। বাবা ও ছেলে দুজনই কারাগারে। একজন পিতা কারাগারে। একজন শিক্ষার্থীও কারাগারে। আর বাড়ির ভেতরে অপেক্ষা করতে থাকে একটি পরিবার।
রাজনীতির পথে যাত্রা। মনোয়ার হোসেন খোকনের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নাম দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত বলে তিনি জানিয়েছেন। স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ২০১৮ সালের ১২ এপ্রিল টঙ্গী পশ্চিম থানা বিএনপির ৭৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার কথা দলীয় সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী তাঁতী দল, গাজীপুর মহানগরের আওতাধীন টঙ্গী পশ্চিম থানা তাঁতী দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতি তাঁর কাছে শুধু মিছিল-মিটিংয়ের বিষয় ছিল, এমনটি তাঁর ঘনিষ্ঠদের বক্তব্যে পাওয়া যায় না। তাঁদের মতে, সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করা, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়াও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অংশ ছিল। তবে রাজনীতি কখনোই শুধু আলো দিয়ে তৈরি নয়। তার সঙ্গে থাকে সংঘাত। বিরোধ। মামলা। গ্রেপ্তার। আর কখনো কখনো দীর্ঘ কারাবাস।
মামলার ছায়া ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতা। মনোয়ার হোসেন খোকনের দাবি অনুযায়ী, রাজনৈতিক অস্থিরতার বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। তিনি বলেন, বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে রাজনৈতিক মামলায় তাঁকে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। তাঁর আরও দাবি, বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার ও শারীরিক নির্যাতনের কারণে তিনি গুরুতর অসুস্থ হন। চোখে আঘাতের পর বাংলাদেশ, ভারত ও থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নেওয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন। তার চোখ এখনও পুরোপুরি সুস্থ না। এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করার মতো চিকিৎসা বা আদালতের নথি এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি। কিছু কাগজপত্র আছে সেটিও সত্য। সাংবাদিকতার নীতিতে তাই তাঁর বক্তব্যকে বক্তব্য হিসেবেই রাখা প্রয়োজন। কারণ ইতিহাসকে শক্তিশালী করে আবেগ নয়, প্রমাণ। শরীরের কষ্ট, মনের লড়াই, মানুষ কখনো কখনো শরীরের ব্যথার চেয়েও বড় ব্যথা বহন করে অপমান, অনিশ্চয়তা, ভয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। মনোয়ার হোসেন খোকনের জীবনেও এমন সময় এসেছে বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা জানান। চিকিৎসার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আবার সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফেরার চেষ্টা করেছেন তিনি। তাঁর একটি বক্তব্য তাঁর অনুসারীরা প্রায়ই স্মরণ করেন, “মানুষকে কষ্ট ভাঙতে পারে, কিন্তু মন শক্ত থাকলে আবার নতুন করে দাঁড়ানো যায়।” হয়তো এটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতীক। পড়ে যাওয়া। আবার ওঠা। আবার হাঁটা।
হজ্ব, ইবাদত ও মানুষের প্রতি দায়িত্ব। জীবনের এক পর্যায়ে পবিত্র হজ্ব পালন করেন মনোয়ার হোসেন খোকন। মক্কা-মদিনার পবিত্র ভূমিতে দাঁড়িয়ে দেশ, পরিবার ও মানুষের কল্যাণ কামনা করার কথা তিনি বলেছেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠরা জানান। ইসলামে ইবাদতের পাশাপাশি ন্যায়, আমানত, দয়া ও মানুষের অধিকার রক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পবিত্র কুরআনের শিক্ষা মানুষকে ন্যায়বিচারে অবিচল থাকার আহ্বান জানায়। এই ধর্মীয় মূল্যবোধই তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলেছে বলে তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীরা মনে করেন।
মানুষের পাশে থাকার গল্প। ঈদ। রমজান। কোরবানির সময়। দুঃস্থ মানুষের প্রয়োজন। এসব সময় তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ডের কথা স্থানীয়দের একটি অংশ স্মরণ করেন। পরিবার ও সমর্থকদের ভাষ্যমতে, তিনি ঈদের পোশাক, কোরবানির মাংস, রমজানের খাদ্যসামগ্রী, মাছ ও অন্যান্য সহায়তা বিতরণ করেছেন। অসহায় পরিবারের পাশে আর্থিকভাবে দাঁড়ানোর কথাও বলা হয়। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করার কথাও স্থানীয়দের কেউ কেউ উল্লেখ করেন। এসব কর্মকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন হিসাব বা নিরীক্ষা এই প্রতিবেদনে করা হয়নি। তবুও স্থানীয় স্মৃতিতে এসব ঘটনা তাঁর সামাজিক পরিচয়ের অংশ হয়ে আছে।
কর্মসংস্থানের স্বপ্ন। মানবিক সহায়তা একদিনের। কর্মসংস্থান দীর্ঘদিনের। মনোয়ার হোসেন খোকনের দাবি অনুযায়ী, গার্মেন্টস ওয়েস্টেজ সংগ্রহের মাধ্যমে প্রায় ৩২০ জন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। অনেক পরিবার এ থেকে জীবিকার পথ পেয়েছিল বলে তাঁর সমর্থকদের দাবি। যদি একটি মানুষের কাজের মাধ্যমে একটি পরিবারও দাঁড়াতে পারে, তাহলে সেই কাজের সামাজিক মূল্য শুধু টাকার হিসাবে মাপা যায় না। তবে সংখ্যাটি তাঁর দাবি, তাই প্রকাশের সময় সংশ্লিষ্ট নথি বা স্বাধীন উৎস দিয়ে যাচাই করা উত্তম।
মসজিদ, ঈদগাহ ও কবরস্থানের সঙ্গে সম্পর্ক। দাঁড়াইল এলাকার মসজিদ, ঈদগাহ ও কবরস্থানের উন্নয়নমূলক কাজে তাঁর সম্পৃক্ততার কথাও স্থানীয়দের একাংশ জানিয়েছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠদের মতে, তিনি মনে করতেন, মানুষের শেষ ঠিকানা কবর; তাই সেই জায়গার মর্যাদা রক্ষা করা জীবিত মানুষের দায়িত্ব। ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে। সেখানে কারও পদ গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো কাজ।
৬ জুলাই ২০২৬ যে সন্ধ্যা বদলে দিল সবকিছু। স্থান, টঙ্গী পশ্চিম থানার দাঁড়াইল পশ্চিমপাড়া। সন্ধ্যার একটি ঘটনা পরদিন ফৌজদারি মামলায় রূপ নেয়। বাদীপক্ষের এজাহারে অভিযোগ করা হয়, দীর্ঘদিনের জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে মনোয়ার হোসেন খোকনসহ কয়েকজন হামলা চালান, বাড়িতে প্রবেশ করেন, আহত করেন এবং মোবাইল ফোন, নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যান। পুলিশের নথিতে এ অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রুজু ও গ্রেপ্তারের কথা উল্লেখ রয়েছে। মনোয়ার হোসেন খোকন ও তাঁর পরিবার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। তাঁদের দাবি ঘটনার পূর্বাপর নিয়ে সামাজিক সালিশ, ভুল বোঝাবুঝি ও উত্তেজনার বিষয় ছিল এবং মামলার বর্ণনার সঙ্গে বাস্তব ঘটনার পার্থক্য রয়েছে। কোনটি সত্য? তার উত্তর দেবে তদন্ত ও আদালত।
পুলিশের নথি, আদালত ও আইনের পথ। পুলিশের নথি অনুযায়ী, ৭ জুলাই ২০২৬ মামলাটি রুজু হয়। মনোয়ার হোসেন খোকন, তাঁর ছেলে আশরাফুল ইসলাম অন্তরসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের জেলহাজতে রাখার আবেদন জানানো হয়। এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, মামলার এজাহার কোনো ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণ করে না। এজাহার হলো অভিযোগের সূচনা। প্রমাণ, তদন্ত, সাক্ষ্য ও আদালতের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে শেষ পর্যন্ত অভিযোগ কতটা সত্য।
টঙ্গী পশ্চিম থানা থেকে কারাগার “আর এক বছরে ফিরবে না” টঙ্গী পশ্চিম থানা থেকে যখন মনোয়ার হোসেন খোকনকে জেলহাজতে পাঠানো হলো, তখন দাঁড়াইলের বাতাসেও যেন নতুন আলোচনা। যাঁকে এতদিন দেখা গেছে সামাজিক অনুষ্ঠানে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে, মানুষের পাশে, তাঁকেই এখন কারাগারের পথে যেতে হচ্ছে। অনেকের ধারণা ছিল, “তিনি হয়তো আর এক বছরে ফিরবেন না।” এটি ছিল মানুষের ধারণা, আদালতের সিদ্ধান্ত নয়। কারও মনে ভয়। কারও মনে ক্ষোভ। কারও মনে প্রশ্ন। আর তাঁর পরিবারের মনে ছিল অপেক্ষা। একটি স্ত্রী অপেক্ষা করছিলেন স্বামীর জন্য। একটি পরিবার অপেক্ষা করছিল অভিভাবকের জন্য। একটি সন্তান অপেক্ষা করছিল বাবার জন্য। আর একজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলে নিজেও তখন আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে গিয়েছিল।
কারাগারের দিনগুলো। কারাগারের দেয়াল মানুষের পরিচয়কে ছোট করে না; বরং অনেক সময় মানুষকে নিজের জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ দেয়। প্রায় ১৫ দিনের সেই অধ্যায় মনোয়ার হোসেন খোকনের জীবনেরও এক কঠিন সময়। রাজনৈতিক পরিচয় তখন বাইরে। সামাজিক পরিচয় বাইরে। মানুষের ভিড় বাইরে। ভেতরে শুধু আইনগত প্রক্রিয়ার অপেক্ষা। শেষ পর্যন্ত আদালতের মাধ্যমে জামিনে মুক্তি পান তিনি। ফিরে আসেন নিজের বাড়িতে। জামিনের পর প্রথম কথা, সংবাদ সম্মেলন, মুক্তির পর তিনি সংবাদ সম্মেলন করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, ন্যায়বিচার। তিনি বলেন, আদালত ও তদন্তকারী সংস্থার প্রতি তাঁর আস্থা রয়েছে। তিনি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত চান। পরিবারও একই দাবি জানায়। পরিবারের পাঁচটি প্রধান বক্তব্য ছিল, নিরপেক্ষ তদন্ত। প্রত্যেক আসামির ভূমিকা পৃথকভাবে মূল্যায়ন। নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন। যাচাইহীন তথ্যের প্রচার বন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন রক্ষা। এগুলো ছিল পরিবারের দাবি।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই আইন ও আদালতের। সংগঠন থেকেও বহিষ্কার। ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি রাজনৈতিক জীবনেও আসে বড় ধাক্কা। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী তাঁতী দল, গাজীপুর মহানগরের আওতাধীন টঙ্গী পশ্চিম থানা তাঁতী দলের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে মনোয়ার হোসেন খোকনকে বহিষ্কার করা হয়। দলীয় সূত্রে বলা হয়, সাংগঠনিক ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্য এটি ছিল একই সঙ্গে আইনি ও সাংগঠনিক সংকট। একদিকে আদালত। অন্যদিকে সংগঠন। একদিকে কারাগার। অন্যদিকে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। কিন্তু ইতিহাস তখনও শেষ হয়নি। অনেক গল্প এখানেই শেষ হয়ে যেত। কিন্তু তাঁর গল্প শেষ হয়নি। কারাগার থেকে তিনি বেরিয়ে এলেন। নিজের বক্তব্য রাখলেন। পরিবারের পাশে দাঁড়ালেন। আইনি প্রক্রিয়ায় আস্থা রাখার কথা বললেন। তারপর অপেক্ষা করলেন সংগঠনের সিদ্ধান্তের জন্য।
অবশেষে এল ৪ আগস্ট ২০২৬। ৪ আগস্ট হারানো দায়িত্ব ফিরে পাওয়া গাজীপুর মহানগর তাঁতী দলের পক্ষ থেকে প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মনোয়ার হোসেন খোকন মিয়ার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাঁকে আবারও টঙ্গী পশ্চিম থানা তাঁতী দলের সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের নির্দেশনার আলোকে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগসমূহ পর্যালোচনা করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি এবং তাঁর দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা ও অবদান বিবেচনায় নিয়ে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। সভাপতি মো. তাজুল ইসলাম বেপারী এবং সাধারণ সম্পাদক মো. তাজ উদ্দিন তাজু কেন্দ্রীয় নির্দেশনার আলোকে সিদ্ধান্তটি অনুমোদন ও কার্যকর করেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। এ ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক নাটকীয় প্রত্যাবর্তন।
বহিষ্কার থেকে পুনর্বহাল, একটি সাংগঠনিক বার্তা। রাজনৈতিক সংগঠনে অভিযোগ ওঠে। তদন্ত বা পর্যালোচনা হয়। সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত হয়। আবার সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনও হতে পারে। মনোয়ার হোসেন খোকনের ক্ষেত্রেও তেমন একটি প্রক্রিয়া দেখা গেল। পুনর্বহালের সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্য, শৃঙ্খলা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটি তাঁর জন্য শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়; সংগঠনের জন্যও নতুন করে সমন্বয়ের আহ্বান। তবে সাংগঠনিক পুনর্বহালকে ফৌজদারি মামলার বিচারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দুটি প্রক্রিয়া পৃথক। একটি দলীয়। অন্যটি আইনগত।
একজন বাবার চোখে সন্তানের ভবিষ্যৎ। মনোয়ার হোসেন খোকনের জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায় সম্ভবত তাঁর ছেলে আশরাফুল ইসলাম অন্তরকে ঘিরে। একজন বাবা যখন নিজের বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে লড়েন, তখন তাঁর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ নিজের জীবন হতে পারে। কিন্তু যখন সন্তানের নামও সেই মামলায় উঠে আসে, তখন উদ্বেগের মাত্রা অন্যরকম। একজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণের সামনে তখন প্রশ্ন ? শিক্ষা? ভবিষ্যৎ? ক্যারিয়ার? সমাজের দৃষ্টি? পরিবারের স্বপ্ন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আদালত ও তদন্তের মাধ্যমে আসবে। তবু একজন বাবার হৃদয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে উদ্বেগ থাকে, তার কোনো আদালত প্রয়োজন হয় না।
সমালোচনার আয়নাও ইতিহাসের অংশ। মনোয়ার হোসেন খোকনের জীবন নিয়ে শুধু প্রশংসা লিখলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকবে। তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। মামলা রয়েছে। বিরোধ রয়েছে। সমালোচনা রয়েছে। অন্যদিকে রয়েছে তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থন। সামাজিক কর্মকাণ্ডের দাবি রয়েছে। রাজনৈতিক সহকর্মীদের সমর্থন রয়েছে। সাংগঠনিক পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত রয়েছে। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো, কোনো পক্ষের আবেগকে সত্যের বিকল্প না করা। কারণ—প্রশংসা প্রমাণ নয়। অভিযোগও প্রমাণ নয়। প্রমাণই সত্য প্রতিষ্ঠার ভিত্তি।
কুরআনের আলোয় ন্যায়বিচারের শিক্ষা। পবিত্র কুরআন মানুষকে ন্যায় ও সত্যের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা দেয়। কোনো ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসা যেন ন্যায় থেকে বিচ্যুত না করে। আবার কারও প্রতি বিরাগও যেন অন্যায় সিদ্ধান্তে না নেয়। এই শিক্ষা শুধু ধর্মীয় জীবনের জন্য নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনেও প্রযোজ্য। মনোয়ার হোসেন খোকনের জীবনকে ঘিরে বর্তমান বাস্তবতায় এই শিক্ষাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদি অভিযোগ সত্য হয়, আইন অনুযায়ী বিচার হোক। যদি অভিযোগ প্রমাণিত না হয়, ন্যায়সঙ্গতভাবে তা থেকে মুক্তি দেওয়া হোক। যদি কারও বিরুদ্ধে ভুল অভিযোগ থাকে, তার প্রতিকার হোক। আর যদি কেউ অপরাধ করে থাকে, তার সামাজিক পরিচয় যাই হোক, আইনের সামনে জবাবদিহি করুক। এটাই ন্যায়। এটাই আইনের শাসন।
একটি জনপদের স্মৃতিতে একজন মানুষ। দাঁড়াইলের গলিতে মানুষের স্মৃতি কখনো আদালতের নথির মতো নয়। সেখানে থাকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কারও মনে থাকে সাহায্য পাওয়ার ঘটনা। কারও মনে থাকে রাজনৈতিক কর্মসূচি। কারও মনে থাকে মসজিদের কাজ। কারও মনে থাকে ঈদের সহায়তা। কারও মনে থাকে মামলা। কারও মনে থাকে বিরোধ। কারও মনে থাকে কারাগারে যাওয়ার রাত। আর এখন কারও মনে থাকবে, কারাগার থেকে ফিরে আবার সংগঠনের দায়িত্বে ফেরার গল্প। এই বহুমাত্রিক স্মৃতিই একজন স্থানীয় ব্যক্তিকে একটি সময়ের চরিত্রে পরিণত করে।
মনোয়ার হোসেন খোকন একটি নামের ভেতর কত গল্প। এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, দাঁড়াইলের শৈশব। কুদরত আলী মাতাব্বরের পারিবারিক উত্তরাধিকার। রোকেয়া বেগমের ধর্মীয় শিক্ষা। অষ্টম শ্রেণিতে থেমে যাওয়া পড়াশোনা। বাস্তব জীবনের সংগ্রাম। ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের চেষ্টা। রাজনীতির মিছিল। বিএনপির সাংগঠনিক পথচলা। তাঁতী দলের দায়িত্ব। মামলা। গ্রেপ্তার। শারীরিক কষ্ট। চিকিৎসা। হজ্ব। মানবসেবা। মসজিদ ও কবরস্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। ৬ জুলাইয়ের ঘটনা। ৭ জুলাইয়ের মামলা। জেলহাজত। প্রায় ১৫ দিনের অপেক্ষা। আদালতের জামিন। সংবাদ সম্মেলন। আত্মপক্ষ সমর্থন। রাজনৈতিক বহিষ্কার। আর ৪ আগস্টের পুনর্বহাল। এগুলো আলাদা আলাদা ঘটনা নয়। এগুলো মিলে একজন মানুষের জীবনপঞ্জি।
ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই মনোয়ার হোসেন খোকন আসলে কে? শুধু রাজনৈতিক কর্মী? শুধু সমাজসেবক? শুধু একজন মামলার আসামি? শুধু একজন বাবা? শুধু একজন স্বামী? শুধু একজন ব্যবসায়ী? শুধু একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ? উত্তর—সম্ভবত এর কোনো একটিই নয়। তিনি এসব পরিচয়ের সমষ্টি। আর মানুষের জীবনকে বুঝতে হলে তার সব পরিচয় একসঙ্গে দেখতে হয়।
আগামী দিনের দায়িত্ব। পুনর্বহালের পর তাঁর সামনে এখন নতুন দায়িত্ব। সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখা। নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করা। মানুষের আস্থা অক্ষুণ্ন রাখা। সামাজিক কর্মকাণ্ডকে আরও স্বচ্ছ করা। আইনের প্রতি আস্থা রাখা এবং বিচারাধীন মামলার ক্ষেত্রে আদালতের প্রক্রিয়াকে সম্মান করা। একজন রাজনৈতিক কর্মীর সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু পদ নয়। মানুষের আস্থা। আর সেই আস্থা অর্জন করা যেমন কঠিন, ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন।
মানুষ চলে যায়, গল্প থেকে যায়। একদিন সব পদ শেষ হবে। রাজনীতির ব্যানার খুলে যাবে। মিছিল থেমে যাবে। সংবাদপত্রের পুরোনো কাগজ হলুদ হয়ে যাবে। মানুষের ভিড় অন্যদিকে চলে যাবে। কিন্তু কিছু গল্প থেকে যাবে। দাঁড়াইলের কোনো বৃদ্ধের স্মৃতিতে। কোনো পরিবারের কৃতজ্ঞতায়। কোনো রাজনৈতিক কর্মীর মুখে। কোনো মসজিদের আঙিনায়। কোনো পুরোনো ছবিতে। কোনো সংবাদপত্রের পাতায়। আর কোনো সন্তানের মনে বাবার স্মৃতি হয়ে। মনোয়ার হোসেন খোকনের জীবনও হয়তো সেভাবেই থেকে যাবে। কারও কাছে সংগ্রামের গল্প। কারও কাছে রাজনীতির ইতিহাস। কারও কাছে মানবিকতার স্মৃতি। কারও কাছে বিতর্কিত এক অধ্যায়। আর কারও কাছে কারাগার পেরিয়ে ফিরে আসা একজন মানুষের গল্প। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, ইতিহাস কাউকে একদিনে চূড়ান্তভাবে বিচার করে না। সময় তাকে দেখে। প্রমাণ তাকে দেখে।
মানুষ তাকে দেখে। আইন তাকে দেখে। আর শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের কাজই তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। তাই মনোয়ার হোসেন খোকনের জীবনের এই অধ্যায়ের শেষ বাক্য হয়তো আজ লেখা সম্ভব নয়। কারণ গল্প এখনও চলছে। আজ তিনি আবার সাংগঠনিক দায়িত্বে। আগামীকাল তাঁর কাজই বলবে তিনি কী রেখে গেলেন। অন্ধকারের পর আলো আসে কিন্তু সেই আলো কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ধারণ করে মানুষের কর্ম। দাঁড়াইলের মাটি থেকে উঠে আসা এই মানুষের জীবন তাই কেবল অতীতের গল্প নয়।
এটি বর্তমানের প্রশ্ন। এটি ভবিষ্যতের অপেক্ষা। এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন। এটি একটি জনপদের স্মৃতি। এটি একটি রাজনৈতিক সময়ের প্রতিচ্ছবি। এবং সর্বোপরি একজন মানুষের অসমাপ্ত জীবনকাব্য।
আল্লাহ তাঁকে সুস্থ রাখুন, ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন, ন্যায় ও সত্যের পথে থাকার তাওফিক দিন এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার শক্তি দান করুন, এটাই তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের দোয়া। কারণ শেষ পর্যন্ত পদ নয়, পরিচয় নয়, প্রচার নয়, মানুষের কর্ম ও চরিত্রই বলে দেয়, একজন মানুষ ইতিহাসে কী রেখে গেলেন।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ ইউনুস আলি মোবাইলঃ ০১৯৭১৮৫৬৮৫৫ ইমেইলঃ sangbadalochona@gmail.com
Developed By : Sabbirelectronics.com